রংপুরের রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অকুতোভয় তরুণ আবু সাঈদের রক্ত আর বৃথা যায়নি। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার দায়ে আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। রায়ে সরাসরি গুলিবর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি ২৮ আসামিকে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জনাকীর্ণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন। বিচারক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং একটি স্বাধীনতাকামী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার রাষ্ট্রীয় অপচেষ্টা ছিল।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন—রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। ভিডিও ফুটেজ ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই দুজনেই সরাসরি নিরস্ত্র আবু সাঈদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন। এ ছাড়া মামলার অন্য গুরুত্বপূর্ণ তিন আসামি—সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজকের এই রায় ঘোষণার আগে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিচারিক প্যানেল রায় পড়া শুরু করেন। আদালত কক্ষে তখন এক থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল। গ্রেপ্তার থাকা ছয় আসামিকে কড়া পাহারায় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে, মামলার প্রধান অভিযুক্ত এবং পুলিশের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ মোট ২৪ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারির পাশাপাশি দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যানুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিন তার সাক্ষ্যে ৩০ জন আসামির প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায় এবং প্রশাসনিক চেইন অফ কমান্ডের ব্যর্থতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর শরিফুল ইসলামসহ ছাত্রলীগ নেতাদের ভূমিকাও আদালতের পর্যবেক্ষণে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছে।
আদালতে সাক্ষ্য প্রদানকারী ২৫ জনের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক ও বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তার দেওয়া জবানবন্দি এবং ঘটনার দিন ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজগুলো মামলার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই রায়ের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ সুগম হলো এবং ভবিষ্যতে কেউ যাতে ক্ষমতার দাপটে নিরপরাধ ছাত্র-জনতার ওপর অস্ত্র চালানোর সাহস না পায়, তার একটি কড়া বার্তা দেওয়া হলো।
রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে উপস্থিত আবু সাঈদের স্বজন ও সাধারণ ছাত্ররা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আবু সাঈদের পরিবার থেকে জানানো হয়েছে, খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার মাধ্যমে আবু সাঈদের আত্মা শান্তি পাবে। তবে পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে জুলাইয়ের বিপ্লবে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া শত শত শহীদের বিচারের পথ প্রশস্ত হলো বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আবু সাঈদ আজ শুধু একটি নাম নয়, বরং প্রতিরোধের এক মহাকাব্য হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রইল। আর সেই মহাকাব্যের খুনিরা আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায় অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হলো।

