রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ধুলোবালিময় রাস্তাটি আজও এক বুক হাহাকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যে রাজপথে দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক নির্ভীক তরুণ, আজ সেই তরুণের রক্তঋণ শোধের দিন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম স্বীকৃত শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে আজ। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আজ নির্ধারণ করবেন সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের দায়বদ্ধতা।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রাজধানীর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় এক থমথমে এবং গম্ভীর পরিবেশ বিরাজ করছে। কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা পড়েছে পুরো এলাকা। এরই মধ্যে কারাগার থেকে কঠোর পাহারায় মামলার ছয়জন গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রিজনভ্যান থেকে তাদের নামানোর সময় চারপাশে উৎসুক জনতার পাশাপাশি সংবাদকর্মীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সবার দৃষ্টি এখন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের দিকে।
আবু সাঈদ শুধু একটি নাম নয়, বরং গত জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে এক অবিনাশী প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তার সেই দুই হাত ছড়িয়ে পুলিশের গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি সারা বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আজ যখন সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে যাচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আবেগঘন প্রত্যাশা কাজ করছে। প্রসিকিউশন বলছে, এই রায় শুধু অপরাধীদের শাস্তি নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্র যখন সাধারণ নাগরিকের ওপর চড়াও হয়, তখন বিচার বিভাগ যে তার ঢাল হতে পারে—তারই প্রমাণ দেবে।
আদালতে আজ যাদের হাজির করা হয়েছে, তাদের তালিকায় রয়েছেন পুলিশের এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এছাড়াও রয়েছেন ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো গুরুতর এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় পড়ে বলে প্রসিকিউশন যুক্তি দেখিয়েছে। আসামিপক্ষ যদিও সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবে ট্রাইব্যুনাল সকল তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখেছেন।
এই মামলার যাত্রা শুরু হয়েছিল গত বছর। ২০২৫ সালের ২৪ জুন তদন্ত সংস্থা তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর ৩০ জুন প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জমা দিলে ট্রাইব্যুনাল ৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর গত ৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় একে একে উঠে এসেছে সেই কালো দিনের লোমহর্ষক বর্ণনা। কীভাবে ক্ষমতার দাপটে একজন নিরস্ত্র শিক্ষার্থীর বুক তছনছ করে দেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিটি মুহূর্ত আদালতের নথিতে উঠে এসেছে।
মামলার বিচার চলাকালে সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি তৈরি হয়েছিল যখন শহীদ আবু সাঈদের বাবা মুকুল হোসেন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন। একজন পিতার আর্তনাদ সেদিন আদালত কক্ষের দেয়ালগুলোকেও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মুকুল হোসেন তার জবানবন্দিতে বলেছিলেন, তার ছেলে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে, কিন্তু সেই মৃত্যুর পেছনের কারিগরদের বিচার না দেখে তিনি মরতে চান না। বিচারক এবং আইনজীবীরা পিনপতন নীরবতায় শুনেছিলেন সেই বৃদ্ধ পিতার হাহাকার।
মামলায় মোট ২৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তার সাক্ষ্য মামলার গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। হাসনাত আবদুল্লাহ ঘটনার দিন উপস্থিত থেকে যে নারকীয় দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিলেন, তা ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন। তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনের সুচারু তদন্ত এবং তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এই মামলাকে এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।
গত ১৩ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ২০ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক। টানা সাত দিন ধরে চলা সেই আইনি লড়াইয়ে প্রসিকিউশন আবু সাঈদের ওপর চালানো গুলিবর্ষণকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনে বিভিন্ন যুক্তি দেখালেও প্রসিকিউশনের সংগৃহীত ডিজিটাল এভিডেন্স এবং ভিডিও ফুটেজ অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে। ২৭ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
আজকের এই রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল সংলগ্ন এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পুলিশ ও র্যাবের টহল বাড়ানো হয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল অভিমুখী প্রতিটি প্রবেশপথে চলছে তল্লাশি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে এই রায় নিয়ে যে প্রবল আবেগ রয়েছে, তা যেন কোনো বিশৃঙ্খলায় রূপ না নেয়, সেদিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে।
আবু সাঈদ হত্যা মামলাটি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এর কারণ শুধু এটি একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রথম বড় বিচার নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক যুগে কোনো অপরাধই চোখের আড়ালে থাকে না। ক্যামেরার লেন্স এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট যেভাবে পুলিশের গুলিবর্ষণের দৃশ্যটি ধরে রেখেছিল, তা আদালতে অপরাধ প্রমাণের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই রায়ের মাধ্যমে আগামী দিনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে একটি শক্তিশালী বার্তা যাবে।
আইনজীবীদের মতে, ৩০ জন আসামির মধ্যে যারা এখনো পলাতক রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আদালত কঠোর নির্দেশনা দিতে পারেন। সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মাধ্যমে পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। তবে আজ ট্রাইব্যুনালের রায়ে যারা উপস্থিত আছেন, তাদের ভাগ্য কী হয় তা জানার জন্য সারা দেশের মানুষ এখন টেলিভিশনের পর্দা এবং অনলাইন পোর্টালগুলোর দিকে চোখ রাখছেন।
রংপুরের সেই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আবু সাঈদ স্বপ্ন দেখতেন বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের সেবা করবেন। তার সেই স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেছে পুলিশের বুলেটে। কিন্তু তার মৃত্যু জাগিয়ে তুলেছে এক ঘুমন্ত জাতিকে। আজ সেই জাগরণের ফসল হিসেবে বিচার বিভাগ তার চূড়ান্ত রায় দিতে যাচ্ছে। রায়ের ভাষ্য যাই হোক না কেন, আবু সাঈদের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
বিকেল গড়ানোর আগেই ট্রাইব্যুনালের এজলাসে ঘোষিত হতে পারে সেই বহু প্রতীক্ষিত রায়। আবু সাঈদের পরিবার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবার একটাই চাওয়া—ন্যায়বিচার। রক্ত দিয়ে কেনা এই স্বাধীনতার পথে আবু সাঈদের রক্ত বৃথা যাবে না, এই প্রত্যাশাতেই আজ বুক বেঁধেছে বাংলাদেশ।

