অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও তার একান্ত সচিব (পিএস) মাসুমের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২৮৬ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে অবৈধ প্রক্রিয়ায় বদলি করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন জনস্বার্থে এই অনুসন্ধানের দাবি জানিয়ে আবেদনটি দাখিল করেন।
দুদকে দেওয়া ওই আবেদনে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘৮ মাসে সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে ঘুষ লেনদেন শতকোটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিকে মূল ভিত্তি হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র আট মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে বদলি-বাণিজ্যের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে প্রচলিত কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই এসব বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানী ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে এই স্বল্প সময়ে ওলটপালট করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে নিজেদের পছন্দের স্টেশনে পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি সুবিধাজনক বদলির জন্য ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বেশিসংখ্যক সাব-রেজিস্ট্রার বদলির নজির আর নেই।
বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয় এবং কর্মকর্তাদেরও তাদের গ্রেড অনুযায়ী পদায়ন করার কথা। কিন্তু আসিফ নজরুলের আমলে এই নিয়মটি পুরোপুরি লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘুষের বিনিময়ে ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের অনেক জুনিয়র কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ ‘এ’ গ্রেডের অফিসে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, যারা টাকা দিতে রাজি হননি, সেই ‘এ’ গ্রেডের সিনিয়র কর্মকর্তাদের ‘শাস্তিমূলক’ হিসেবে প্রান্তিক বা নিম্ন গ্রেডের অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারী ব্যারিস্টার সারোয়ার হোসেন জানান, বদলি-বাণিজ্যের এই অরাজকতা এতটাই চরমে উঠেছিল যে, কোনো কোনো কর্মকর্তাকে মাত্র ছয়-সাত মাসের ব্যবধানে তিন থেকে চারবার বদলি হতে হয়েছে। এমনকি যোগদানের আগের দিনও নতুন বদলির আদেশ আসার মতো ঘটনা ঘটেছে। যখন এই কেলেঙ্কারি জানাজানি হতে শুরু করে, তখন গত বছরের ১ জুন আইন মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে একটি সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানায় যে, বদলির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এই বিজ্ঞপ্তি আসার আগেই শতকোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।
দুদকের কাছে জমা দেওয়া আবেদনে আরও বলা হয়, উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের পিএস মাসুম এই পুরো প্রক্রিয়ার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন। প্রতিশ্রুত টাকা দিতে দেরি হওয়ায় অনেক কর্মকর্তার বদলির আদেশ মাঝপথে স্থগিত করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণও এখন সামনে আসছে। মূলত মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আশকারা ছাড়া এমন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদক কর্তৃপক্ষ আবেদনটি গ্রহণ করেছে এবং প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আসিফ নজরুল উপদেষ্টা হিসেবে থাকাকালীন সময়ে নিজের ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তি’ প্রচার করলেও এই নতুন অভিযোগ তার সেই অবস্থানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়ায় এই শতকোটি টাকার রহস্যের জট কতটুকু খোলে।
আওয়ামী লীগ পরবর্তী সময়ে সুশাসনের যে অঙ্গীকার নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ শুরু করেছিল, সেই সরকারেরই একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।

