দেশের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বুধবার সন্ধ্যায় এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দফায় দফায় হাতাহাতি ও উত্তেজনার জেরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, উত্তপ্ত পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ভেতরে চিকিৎসাধীন অনেক রোগীকেও জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার বিকেল থেকেই এক রোগীর ইনজেকশন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিতণ্ডার সূত্রপাত হয়। এর জের ধরে সন্ধ্যা ৭টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বর্তমানে জরুরি বিভাগের প্রধান ফটক বা ‘কেচি গেট’ ভেতর থেকে তালাবদ্ধ করে রেখেছেন চিকিৎসকরা। অন্যদিকে বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে হলের শত শত শিক্ষার্থী।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে চিকিৎসা নিতে আসা জেসমিন আক্তার নামে এক নারী তার অসহায়ত্বের কথা জানান। তিনি বলেন, “কয়েকদিন ধরে অসুস্থ শরীর নিয়ে এখানে এসেছি। এক ঘণ্টা আগে টিকিটও কেটেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে শোরগোল শুরু হতেই আনসার সদস্যরা আমাদের ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল। এখন কোথায় যাব, কার কাছে চিকিৎসা নেব জানি না।” জেসমিনের মতো এমন শত শত রোগী এখন হাসপাতালের বারান্দায় ও খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষা করছেন।
ঘটনার মূলে রয়েছে একটি ইনজেকশন কেনাকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ ইমন অভিযোগ করেন, তার এক অসুস্থ ছোট ভাইকে নিয়ে হাসপাতালে এলে চিকিৎসক তিনটি ওষুধ লিখে দেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেই ওষুধ কোথাও না পেয়ে তারা পুনরায় চিকিৎসকের কাছে বিকল্প ওষুধ লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই অনুরোধের পরই কর্তব্যরত চিকিৎসক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন এবং একপর্যায়ে হামলা চালান।
তবে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে ভিন্ন দাবি করা হয়েছে। জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোস্তাক আহমেদ জানান, যে ইনজেকশনটি (নেলবান) প্রেসক্রাইব করা হয়েছিল সেটি বিশেষ ঘরানার ওষুধ। এটি না পেয়ে শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হন। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আপাতত গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসা সেবা স্থগিত করা হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বাইরে থেকে শিক্ষার্থীরা গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
জরুরি বিভাগের সামনে এখন থমথমে পরিস্থিতি। ভেতরে চিকিৎসকরা অবস্থান করছেন, আর বাইরে শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। অনেক রোগীর স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা গেছে। একজনের ভাই অপারেশন থিয়েটারে থাকা সত্ত্বেও তাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন। কেচি গেটের ওপাশে আনসার সদস্যদের কড়া পাহাড়ায় জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীরাও এখন জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর আমরা খবর পাই যে চিকিৎসকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কথা কাটাকাটি হয়েছে। খবর পেয়েই পুলিশের একটি বড় দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। আমরা উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছি। তবে বর্তমানে চিকিৎসা সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, একুশে হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের এই হাতাহাতির পর নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে নতুন কোনো রোগী নেওয়া হচ্ছে না। জরুরি বিভাগের কার্যক্রম কতক্ষণ বন্ধ থাকবে সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাত বাড়ার সাথে সাথে হাসপাতালের পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা বনাম শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—এই দুই পক্ষের লড়াইয়ে মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে মুমূর্ষু রোগীরা। কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অচলাবস্থা কাটানো কঠিন বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। আপাতত দেশের বৃহত্তম এই চিকিৎসাকেন্দ্রে কেবল স্লোগান আর উত্তেজনাই বিরাজ করছে, নেই কেবল মানবিক চিকিৎসা সেবা।

