ছয় মাস বয়সী দুই বোন, রিসা আর রুহি। গাজীপুরের একটি সাধারণ পরিবারে তাদের আগমনে খুশির অন্ত ছিল না। কিন্তু সেই ঘর এখন নিস্তব্ধ। নিয়তির এক নিষ্ঠুর খেলায় যমজ দুই বোনের একজন আজ চিরতরে চোখ বুজেছে, আর অন্যজন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) লড়ছে জীবনের শেষ লড়াই।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায় এক অসহনীয় দৃশ্য। রিসার নিথর দেহ তখনো মায়ের কোলে। পাশেই আইসিইউর কাঁচের দেয়ালের ওপারে ধুঁকছে রুহি। মা কনিকা বেগম যেন পাথর হয়ে গেছেন। শোকের তীব্রতা এতই যে, তার চোখ দিয়ে পানি নামার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই।
গত বুধবার থেকে এই পরিবারের কষ্টের শুরু। হামের উপসর্গ নিয়ে গাজীপুর থেকে ঢাকায় হন্যে হয়ে ঘুরেছেন তারা। ঢাকা মেডিকেল থেকে শিশু হাসপাতাল—কোথাও খালি ছিল না কোনো শয্যা। নিরুপায় হয়ে এক রাত বেসরকারি পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে কাটিয়ে অবশেষে ঠাঁই মেলে শিশু হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শুধু হাম নয়, রিসার শরীরে থাবা বসিয়েছিল নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্ট। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে রিসা চলে যায় না ফেরার দেশে। তার যমজ বোন রুহির অবস্থাও এখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন। তাকেও দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
হাসপাতালের আইসিইউর সামনে কেবল কনিকা বেগম নন, ভিড় করে আছেন আরও অনেক বাবা-মা। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা রিসার মামা তানভীর হোসেনের কণ্ঠে ঝরে পড়ল গভীর হাহাকার। তিনি বলেন, “আল্লাহ একজনকে নিয়ে গেছেন, অন্যজনকেও যেন কেড়ে না নেন। আমরা শুধু রুহিকে ওর মায়ের কোলে সুস্থ দেখতে চাই।”
বর্তমানে এই হাসপাতালের আইসিইউতে ১৪টি শিশু মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এদের অধিকাংশের বয়স ১০ মাসেরও কম। দায়িত্বরত চিকিৎসকরা বলছেন, ভর্তি থাকা শিশুদের মধ্যে ১৩ জনের অবস্থাই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার এই প্রাণঘাতী সংমিশ্রণ শিশুদের ফুসফুসকে দ্রুত অকেজো করে দিচ্ছে।
আইসিইউর দরজায় বারবার উঁকি দিচ্ছিলেন বৃদ্ধ নুরুল হক। তার ১০ মাস বয়সী নাতনি জোবায়দাও সেখানে ভর্তি। প্রথমে সাধারণ নিউমোনিয়া মনে হলেও পরে শিশুটির শরীরে হামের র্যাশ দেখা দেয়। নাতনিকে একবার দেখার আকুলতা আর অনিশ্চয়তার ভয় নুরুল হকের চোখেমুখে স্পষ্ট।
পুরো হাসপাতাল জুড়েই এখন শয্যা সংকট আর হাহাকার। মিরপুর থেকে আসা মুন্নি বেগম তিন মাসের শিশু রিফাতকে নিয়ে জরুরি আইসিইউ খুঁজছিলেন। কিন্তু এখানে কোনো জায়গা না পেয়ে তাকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ছুটতে হয়েছে অন্য হাসপাতালের সন্ধানে। বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও সন্তানকে বাঁচানোর তাগিদে তিনি এখন দিশেহারা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে হাম আক্রান্ত ৬১ জন শিশু বিশেষায়িত ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে চারজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হিসাব বলছে, ঢাকা বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ৫ এপ্রিল যেখানে ৩৯২ জন আক্রান্ত ছিল, আজ সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯৯ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান আরও ভীতিকর চিত্র তুলে ধরছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত কেবল ঢাকা বিভাগেই ৬০টি শিশু হামের কারণে প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি এমন জটিল আকার ধারণ করেছে।
রাজধানীর এই করিডোরগুলোতে এখন শুধু ওষুধের গন্ধ আর দীর্ঘশ্বাস। ছোট ছোট কফিনগুলো যখন হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে। কনিকা বেগমের মতো মায়েদের খালি কোল আর কত বড় হলে টনক নড়বে প্রশাসনের, সেই উত্তর এখনো অজানা।
হামের এই মহামারি রূপ রুখতে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার তাগিদ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তা না হলে রিসার মতো আরও অনেক প্রাণ অকালেই ঝরে যাবে, আর রুহিদের মতো শিশুদের লড়তে হবে অসম এক যুদ্ধে। দিনশেষে শোকাতুর পরিবারগুলোর কাছে এসব পরিসংখ্যানের চেয়ে বড় হয়ে বিঁধছে প্রিয়জনকে হারানোর গভীর ক্ষত।

