জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও গণভোটের অমীমাংসিত ইস্যুকে কেন্দ্র করে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বুধবার বিকেলে একযোগে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। মূলত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় এই কঠোর অবস্থান নেয় বিরোধী পক্ষ।
অনির্ধারিত আলোচনার শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান আইনমন্ত্রীর পূর্ববর্তী বক্তব্যের সূত্র ধরে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, গতকাল সংসদে গণভোট এবং সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে একটি বিশেষ পরিষদ গঠনের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সরকার পক্ষ তা এড়িয়ে যেতে চাইছে। তিনি দাবি করেন, এই সংস্কারের সাথে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের আকাঙ্ক্ষা জড়িত, যা কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হোক যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকবে। কিন্তু আইনমন্ত্রী বা সরকারের আচরণে কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধানের ইঙ্গিত মেলেনি।” তিনি স্পিকারের কাছে বিষয়টির একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং কার্যকর প্রতিকার দাবি করেন।
উত্তরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম সংসদীয় রীতির উদাহরণ টেনে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি জানান যে, দেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে হাতেগোনা কয়েকটি মুলতবি প্রস্তাব আলোচনার জন্য গৃহীত হয়েছে এবং বর্তমান সরকার অত্যন্ত উদারতা দেখিয়ে বিরোধী পক্ষকে কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে। স্পিকার বলেন, “যে সমস্যা কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব, তা নিয়ে সাধারণত মুলতবি প্রস্তাব হয় না। তবুও আমরা আপনাদের জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ দিয়েছি।”
তবে স্পিকারের এই আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বিরোধী দল। ডা. শফিকুর রহমান পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, নির্বাচনের আগে দুই পক্ষই সংস্কারের বিষয়ে একমত ছিল, কিন্তু এখন সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, মূল আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে এবং বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে কৌশলে নতুন আরেকটি নোটিশ সামনে আনা হয়েছে। স্পিকার বারবার ধৈর্য ধরার অনুরোধ করলেও বিরোধী সদস্যরা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
ওয়াকআউটের আগে ডা. শফিকুর রহমান স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন, “যেখানে জনমতের প্রতিফলন নেই এবং জনগণের দাবির অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, সেখানে থেকে আমরা দেশবাসীকে কী বার্তা দেব? আমরা এই অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে সংসদ ত্যাগ করছি।” এরপরই বিরোধী বেঞ্চের সকল সংসদ সদস্য অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
বিরোধী সদস্যদের অনুপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ অধিবেশনের পরবর্তী আলোচনায় অংশ নেন। তিনি দাবি করেন, বিরোধী দলের আনা মুলতবি প্রস্তাবটি প্রক্রিয়াগতভাবে সঠিক ছিল না। সংসদীয় বিধি অনুযায়ী, যে বিষয়টির সমাধান কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই সম্ভব, তা নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব বা ভোটাভুটির কোনো আইনি সুযোগ নেই। তিনি বিরোধী দলের এই ওয়াকআউটকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেন।
পরবর্তীতে স্পিকার অধিবেশনের স্বাভাবিক কার্যসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদের প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ে। সংবিধান সংস্কারের মতো একটি স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিত রেখেই দিনের অধিবেশনের এক পর্যায় শেষ হয়। এই ঘটনা বর্তমান সংসদের ভেতরে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক দূরত্বেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

