বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তার একটি ভয়াবহ চিত্র আজ জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে তিনি জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
সংসদ অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, পাচার হওয়া এই বিশাল অংকের অর্থ পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। এরই মধ্যে দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক এবং অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলেন, গত দেড় দশকে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১.৮ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে বাইরে চলে গেছে। এই অর্থ পাচারের প্রধান গন্তব্য হিসেবে ১০টি রাষ্ট্রকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো।
পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ (MLAT) স্বাক্ষরের বিষয়ে প্রাথমিক সম্মতি পাওয়া গেছে। বাকি সাতটি দেশের সাথেও এই চুক্তি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
আদালতের নির্দেশে এখন পর্যন্ত জব্দ হওয়া সম্পদের হিসাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের অভ্যন্তরে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি টাকার সম্পদ বর্তমানে সরকারি নিয়ন্ত্রণে বা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। অর্থ পাচার রোধ এবং পাচারকারী চক্রকে ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, এ পর্যন্ত মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত ১৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১১টি অগ্রাধিকারভিত্তিক মামলার তালিকা।
এই তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি দেশের প্রভাবশালী বেশ কয়েকটি শিল্পগ্রুপের নাম উঠে এসেছে। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, বসুন্ধরা, সামিট এবং নাসা গ্রুপের মতো বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ খতিয়ে দেখছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দৃঢ়তার সাথে বলেন, “বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা আমাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। আমরা সেই কথা রাখছি। যারা দেশের মানুষের রক্তঘাম করা টাকা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং সেই সম্পদ ফিরিয়ে আনাকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।”
সংসদ অধিবেশনের এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান প্রশাসন বিগত সরকারের অর্থনৈতিক অনিয়মের মূল উৎপাটন করতে চায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বড় বড় শিল্পগ্রুপ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করার মাধ্যমে সরকার একটি কঠোর বার্তা দিয়েছে— দুর্নীতির প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে এই পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদের আজকের এই অধিবেশনটি মূলত বিগত দীর্ঘ সময়ের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক ক্ষতের এক দালিলিক উপস্থাপনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

