দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন সেই আগুনের আঁচ এসে পৌঁছাল খোদ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে। সোমবার বিকেলের অধিবেশনে সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল ও অকটেনের হাহাকার চলছে। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, স্বয়ং একজন সংসদ সদস্য নিজের গাড়ির জন্য কয়েক পাম্প ঘুরেও তেল পাননি বলে সংসদকে জানিয়েছেন।
সোমবার (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের ওপর আলোচনা চলাকালে এই বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে চলা এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারিভাবে দাবি করা হচ্ছে যে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি নিজে আজ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার শিকার। নিজের গাড়িতে তেল নেওয়ার জন্য একের পর এক পাম্পে ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও তেল পাইনি। আমি যদি একজন সংসদ সদস্য হয়ে এই অবস্থায় পড়ি, তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কোন চরমে পৌঁছেছে, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে?”
তার এই বক্তব্যের রেশ ধরে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলামও নিজ এলাকার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, পাম্পগুলোতে পেট্রোল ও অকটেন মিলছে না বলে সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ অদ্ভুত বিষয় হলো, পাম্পের বাইরে খোলা বাজারে বোতলে করে ঠিকই চড়া দামে তেল বিক্রি হচ্ছে।
নজরুল ইসলাম আরও যোগ করেন, “মোটরসাইকেল চালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনছে। এটা কি কৃত্রিম সংকট নাকি সরবরাহ ঘাটতি, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সাধারণ মানুষ এভাবে চরম হয়রানির শিকার হতে পারে না।”
অধিবেশনে উপস্থিত অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও টেবিল চাপড়ে এই অভিযোগের প্রতি সমর্থন জানান। তারা দাবি করেন, তেল সংকটের কারণে পরিবহন ব্যবস্থা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি কৃষিকাজেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ এবং সরবরাহ স্বাভাবিক করার জোর দাবি জানান তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ চেইনে বিশৃঙ্খলার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে তেলের পাম্পগুলো কয়েক দিন ধরেই বন্ধ থাকছে। ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের সংকটের খবর পাওয়া গেছে। তবে বাংলাদেশে এই সংকটের পেছনে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না, তা নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই অভিযোগ উত্তাপিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। আপাতত তেলশূন্য পাম্প আর দীর্ঘ সারিই বলে দিচ্ছে যে, সংকট কেবল কাগজে-কলমে নয়, রাজপথেও প্রখর হয়ে উঠেছে।
পরিশেষে, সংসদ সদস্যরা এই পরিস্থিতির দ্রুত নিরসনে সরকারকে কঠোর মনিটরিং এবং বিদেশ থেকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। জনভোগান্তি চরমে পৌঁছানোর আগেই এই সংকটের সমাধান না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

