দেশে চলমান তথাকথিত ‘মব কালচার’ বা জনতাকে উসকে দিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আর কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দাবি আদায়ের দোহাই দিয়ে রাস্তাঘাট অবরোধ কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে সরকার এখন থেকে সর্বোচ্চ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান। এদিন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিগত সরকারের আমলের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘মব কালচার’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
রুমিন ফারহানা সংসদে দেওয়া পরিসংখ্যানে দাবি করেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকি তিনি নিজেও গত ২১ ফেব্রুয়ারি ব্যক্তিগতভাবে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জানতে চান তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলছি—বাংলাদেশে কোনো ধরনের মব কালচারের ঠাঁই হবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দাবি আদায়ের নামে মহাসড়ক বা জনপদ অবরোধ করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাকে আমরা আর বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় (Allow) দেব না।”
মন্ত্রী মব ভায়োলেন্স এবং সুসংগঠিত অপরাধের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি ব্যাখ্যা করে বলেন, সব ঘটনাকে ঢালাওভাবে ‘মব’ বলা ঠিক হবে না। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনায় হামলা কিংবা ভাঙচুর করা মূলত একটি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত অপরাধ। এ ধরনের প্রতিটি ঘটনায় মামলা দায়ের করা হচ্ছে এবং তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জনগণের দাবি-দাওয়া থাকতেই পারে, কিন্তু তা প্রকাশের ধরণ হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়া, গোলটেবিল বৈঠক বা শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশ করার অধিকার সবার আছে। আমরা বাকস্বাধীনতা ও সংগঠনের অধিকারে বিশ্বাসী। তবে মব বা বিশৃঙ্খল জটলা তৈরি করে দাবি আদায়ের যে সংঘাতময় প্রবণতা, তা থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে তুচ্ছ ঘটনায় গণপিটুনি কিংবা হুটহাট রাস্তা অবরোধের মতো ঘটনা জনজীবনে অস্বস্তি সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের এই কঠোর বার্তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাঠ পর্যায়ে আরও সক্রিয় হতে সাহায্য করবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—রাজনৈতিক বা সামাজিক যেকোনো দাবি আদায়ের পথ যেন জনভোগান্তির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।
সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রীর এই দৃঢ় অবস্থান আইনশৃঙ্খলার বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অনেকে। এখন দেখার বিষয়, মাঠ পর্যায়ে এই হুঁশিয়ারির বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে করা হয় এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়।

