জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন করে তড়িঘড়ি কোনো প্রস্তাব পাসের সংস্কৃতিতে ফিরতে নারাজ সরকার। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত মুলতবি প্রস্তাবের আইনি ও কারিগরি বৈধতা নিয়ে আজ সংসদে কঠোর প্রশ্ন তুলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, জুলাই জাতীয় সনদ বা সংবিধান সংস্কারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনার জন্য যথাযথ সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
রোববার (২৯ মার্চ) রাতে সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সংসদকে যেন ‘আগের কালচারে’ অর্থাৎ নিয়মবহির্ভূত আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত না করা হয়।
নোটিশের কারিগরি ত্রুটি ও বিধির মারপ্যাঁচ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে কার্যপ্রণালী বিধির ৬৬ ও ৬৮ নম্বর ধারার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা যে নোটিশটি দিয়েছেন, তা বিধি ৬২ অনুযায়ী জনগুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু এর যে বিষয়বস্তু—জুলাই জাতীয় সনদ বা সংবিধান সংস্কার—তা কেবল একটি সাধারণ ডিবেট বা আলোচনার বিষয় নয়। এর প্রতিকার লুকায়িত আছে আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধনের মধ্যে।”
তিনি আরও বলেন, “রুলস অব প্রসিডিউরের ৬৩ বিধিতে স্পষ্ট বলা আছে, এমন কোনো প্রস্তাব মুলতবি হিসেবে আনা যাবে না যার সমাধান কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সম্ভব। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব হতে পারে, কিন্তু সংবিধান সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয় এভাবে হুট করে আলোচনায় আসতে পারে না।”
‘আগের কালচারে’ ফেরার শঙ্কা
সংসদ পরিচালনায় স্পিকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়ে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আপনি বিরোধী দলকে ফ্লোর দেবেন, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু আমরা যেন আগের সেই বিশৃঙ্খল কালচারে ফেরত না যাই যেখানে বিধির তোয়াক্কা করা হতো না। আপনি হাউসের লর্ড, আপনি চাইলে নোটিশ সংশোধন করতে বলতে পারেন অথবা স্থগিত করতে পারেন। কিন্তু আইনগত ভিত্তিহীন কোনো আলোচনা এই সার্বভৌম সংসদে শুরু করা সংগত হবে না।”
তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর প্রস্তাবে পুরো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও ‘সংবিধান সংস্কার আদেশ ২০২৫’ পড়ে শুনিয়েছেন, যা মুলতবি প্রস্তাবের আওতাভুক্ত নয়। এটি কেবল সংসদীয় বিতর্কের দিন নির্ধারিত হলেই সম্ভব।
সংবিধান সংস্কার কমিটির প্রস্তাব
তর্ক-বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি গঠনমূলক ও ‘ফেয়ার প্রপোজাল’ (সুষ্ঠু প্রস্তাব) পেশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা সবাই সংবিধান সংস্কার বা সংশোধন করতে চাই। কিন্তু পার্লামেন্টের ভাষা অনুযায়ী এটি হয় প্রণীত হবে, না হয় সংশোধিত হবে। তাই আমার প্রস্তাব হলো—ট্রেজারি বেঞ্চ (সরকারি দল), বিরোধী দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘কনস্টিটিউশন রিফর্ম কমিটি’ বা সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করা হোক।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও যোগ করেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আমরা এমন একটি দলিল রচনা করতে চাই যা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে। সংসদে সমঝোতার ভিত্তিতে একটি কমিটি হোক, যেখানে সবাই তাঁদের প্রস্তাব দেবেন। জুলাই জাতীয় সনদকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব, কারণ এটি সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সবার স্বাক্ষরিত একটি পবিত্র অঙ্গীকার।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সংবিধান সংশোধনের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল একটি জরুরি আলোচনার মাধ্যমে শেষ করা সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন। এখন স্পিকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তিনি বিধিবহির্ভূত আলোচনা চালিয়ে যাবেন নাকি সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটবেন।

