দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) গত ১৬ বছরের অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড় সরানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৮ সাল থেকে বিসিবিতে হওয়া সব ধরনের ‘অবৈধ’ নিয়োগ, দলীয় প্রভাব এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়ে কঠোর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
আজ রোববার (২৯ মার্চ) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ক্রিকেট বোর্ডকে যারা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পত্তিতে পরিণত করেছিলেন, তাদের দিন শেষ। দ্রুতই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের চিহ্নিত করা হবে।
ভোটের অধিকার হরণে বিসিবির জনবল ব্যবহার
বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এক বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেন। তিনি দাবি করেন, বিসিবির অর্থ ও জনবল ব্যবহার করে একটি বিশেষ গোষ্ঠী বিগত সময়ে সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করার মতো রাজনৈতিক অপকর্মে সরাসরি সহায়তা করেছে।
প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আপনারা শুনে অবাক হবেন, ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ ও লোকবল ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে। যারা এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, বরং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ক্রীড়াঙ্গনকে ‘রাজনীতিমুক্ত’ করার অঙ্গীকার
সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন তাঁর অভিযোগে জানান, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিসিবির কতিপয় কর্মকর্তা বোর্ডের সম্পত্তি ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। এর জবাবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ক্রিকেটসহ দেশের সব খেলাধুলাকে নজিরবিহীনভাবে দলীয়করণ করা হয়েছিল।
তিনি আরও যোগ করেন, “রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশের ক্রীড়াঙ্গন স্থবির হয়ে ধ্বংসের মুখে চলে গেছে। বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় ক্রীড়াঙ্গনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার কাজ শুরু করেছে। আমরা চাই মাঠের খেলা মাঠে থাকুক, রাজনীতির ড্রয়িংরুমে নয়।”
দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নেবে দুদক
কেবল নিয়োগ নয়, বিসিবির প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, বোর্ডের বেশ কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি আহ্বান জানিয়ে আমিনুল হক বলেন, “আমি দুদকের মহাপরিচালককে অনুরোধ করব, বিসিবির দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সম্পদের বিষয়ে কোনো তদন্ত চলমান থাকলে তা যেন আমাদের অবগত করা হয়। আমরা সেই তথ্য জাতির সামনে উন্মোচন করতে চাই। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
তদন্ত কমিটির কর্মপরিধি
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত তদন্ত কমিটি ২০০৮ সাল থেকে বিসিবির প্রতিটি নিয়োগের নথিপত্র যাচাই করবে। বিশেষ করে যারা কোনো প্রকার সার্কুলার বা যোগ্যতা ছাড়াই কেবল দলীয় সুপারিশে বিসিবিতে স্থায়ী হয়েছেন, তাদের তালিকা করা হবে। এছাড়া বোর্ডের বিভিন্ন টেন্ডার ও নির্মাণকাজে কোনো আর্থিক অনিয়ম হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থানের পর মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামসহ বিসিবির অন্দরমহলে এখন চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। দেশের ক্রিকেট ভক্তরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আশা করছেন, এর মাধ্যমে দেশের ক্রিকেট প্রশাসন সত্যিকারের পেশাদারিত্বের পথে ফিরবে।

