জাতীয় সংসদের নবনিযুক্ত ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণে এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। সংসদকে কোনো গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বরং জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন তিনি। আজ রোববার (২৯ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি বৈঠকে সভাপতিত্ব করার সময় তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র রক্ষায় পূর্ণ নিরপেক্ষতার শপথ নেন।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সংসদকে গতানুগতিক ধারার বাইরে এক ‘বিপ্লবী’ ও ‘ঐতিহাসিক’ সংসদ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সংবিধান এবং কার্যপ্রণালী বিধিই হবে এই সংসদ পরিচালনার একমাত্র মানদণ্ড। কোনো প্রকার স্বজনপ্রীতি বা দলীয় সংকীর্ণতা এখানে ঠাঁই পাবে না।
কৃতজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণ
বক্তব্যের শুরুতেই ডেপুটি স্পিকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি। একই সঙ্গে নিজের নির্বাচনী এলাকা কলমাকান্দা-দুর্গাপুরের জনগণের ভালোবাসার কথা স্মরণ করেন। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি গড়েছিলেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “খালেদা জিয়া স্বৈরাচার বিরোধী দীর্ঘ আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে এ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ তিনি বিশ্বজুড়ে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে স্বীকৃত।” তাঁর এই ত্যাগী নেতৃত্বই আজকের এই গণতান্ত্রিক পরিবেশের পথপ্রদর্শক বলে মন্তব্য করেন কায়সার কামাল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ত্যাগের ফসল
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানকে গণতন্ত্রের নতুন সূর্যোদয় হিসেবে বর্ণনা করেন ডেপুটি স্পিকার। তিনি বলেন, “এই সংসদ কোনো সাধারণ লটারি নয়, বরং এটি শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম ও মীর মুগ্ধসহ হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে যে জনগণের শক্তিই গণতন্ত্রের প্রকৃত ভিত্তি।”
তিনি আরও যোগ করেন, অসংখ্য মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, গুম ও নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন। তাঁদের এই মহান আত্মত্যাগই আজ আমাদের এই পবিত্র সংসদে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই এই সংসদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে জনগণের কল্যাণে।
নিরপেক্ষতার অগ্নিপরীক্ষা
সংসদ পরিচালনায় শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ডেপুটি স্পিকার এক নজিরবিহীন ঘোষণা দেন। তিনি জানান, নিরপেক্ষতা রক্ষার্থে তিনি ইতিমধ্যে সরকার এবং সকল দলীয় পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন। স্পিকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি সংসদের প্রতিটি সদস্যের অধিকার, মর্যাদা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কাজ করবেন।
ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর আদর্শের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমি যদি সঠিক পথে চলি তবে আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন, আর যদি ভুল করি তবে নির্ভয়ে শুধরে দেবেন। কারণ এই সংসদে আমার চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বরা আছেন।”
‘মজলুমদের সংসদ’ ও আইনের শাসন
এবারের সংসদের বিশেষত্ব তুলে ধরতে গিয়ে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “এই সংসদ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। কারণ এখানকার অনেক সদস্য সরাসরি ফাঁসির মঞ্চের কন্ডেম সেল থেকে এসেছেন, কেউ এসেছেন অন্ধকার ‘আয়নাঘর’ থেকে, কেউবা দীর্ঘ নির্বাসন কিংবা গুম-নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে। আমরা সবাই এখানে কোনো না কোনোভাবে মজলুম হিসেবে সমবেত হয়েছি।”
বিখ্যাত আইনবিদ এভি ডাইসির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আইনের শাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—সেটি সরকার হোক কিংবা সাধারণ জনগণ। যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার সুবাদে আমি ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইলের গণতন্ত্রের যে সৌন্দর্য দেখেছি, সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি জাতীয় স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং গঠনমূলক সমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বাস করেন, জাতীয় সংসদ হবে জাতির দর্পণ এবং এর প্রতিটি কার্যক্রম হবে জনকল্যাণমুখী।


1 Comment
Looking for the 188bet download link. Anyone got a safe and reliable one? Don’t want to download any dodgy stuff! Would be great to have it on my phone. 188bet download