ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দযন্ত্র বা সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাট নিয়ে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংসদীয় কমিটি। এই যান্ত্রিক গোলযোগের পেছনে কোনো পরিকল্পিত ‘নাশকতা’ বা ‘সাবোটাজ’ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৩ এপ্রিলের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
শনিবার বিকেলে সংসদ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সাংবাদিকদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম দিনে গুরুত্বপূর্ণ কার্য চলাকালীন হঠাৎ সাউন্ড সিস্টেমে গোলযোগ দেখা দিলে অধিবেশনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। এই ঘটনায় সংসদ সদস্যদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিষয়টি নিয়ে খোদ সংসদ ভবনের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
নাশকতা নাকি নিছক কারিগরি ত্রুটি?
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, সাউন্ড সিস্টেমের এই বিভ্রাটকে তারা হালকাভাবে নিচ্ছেন না। তিনি বলেন, “অধিবেশনের প্রথম দিনেই কেন এমন ঘটনা ঘটল, এর পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে কি না তা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।” তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মসের নেতৃত্বে কমিটি গঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির আড়ালে কোনো মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ ছিল কি না, তা বুয়েটের বিশেষজ্ঞরাই কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করবেন।
এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সংসদের সাউন্ড সিস্টেম ও হেডফোনের মান নিয়ে অধিবেশনে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সংসদ সদস্যদের অভিযোগ, হেডফোনগুলো ব্যবহার করা কেবল কষ্টসাধ্যই নয়, বরং তা অত্যন্ত নিম্নমানের।
‘ঢাউস’ হেডফোন ও সংসদীয় অস্বস্তি
নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে গিয়ে চিফ হুইপ নিজেও হেডফোন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “হেডফোন নিয়ে প্রায় সব সদস্যেরই অভিযোগ রয়েছে। এত বড় এবং ঢাউস এক একটা হেডফোন মাথায় দিয়ে পার্লামেন্টের কথা শোনা তো যায়ই না, উল্টো মাথা ও কান গরম হয়ে যায়। এই মান্ধাতা আমলের যন্ত্রপাতি আমরা দ্রুত পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” উন্নত বিশ্বের সংসদগুলোর আদলে আধুনিক ও ব্যবহারবান্ধব অডিও সিস্টেম স্থাপনের পরিকল্পনা করছে বর্তমান সংসদ কমিটি।
আবাসন ও অন্যান্য সুবিধার পুনর্বিন্যাস
বৈঠকে কেবল সাউন্ড সিস্টেম নয়, বরং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আবাসন ও চিকিৎসা সুবিধা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। চিফ হুইপ জানান, মন্ত্রী, স্পিকার ও হুইপদের বাইরে সাধারণ সংসদ সদস্যদের ফ্ল্যাট বরাদ্দ ও আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করার কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যে, আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম কেনা শেষ করে আবাসনগুলো সংসদ সদস্যদের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা হবে।
সাউন্ড সিস্টেম সংস্কারে কেন আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে নূরুল ইসলাম ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “৫ আগস্টের পর দেশের নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এমনকি নির্বাচনের দিনও অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। সেই ডামাডোলের কারণে কিছু সংস্কার কাজ পিছিয়ে গিয়েছিল, তবে এখন আমরা সবকিছু নিয়মমাফিক গুছিয়ে নিচ্ছি।”
আগামী দিনের প্রস্তুতি
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংসদের ডিজিটাল অবকাঠামো আমূল বদলে ফেলার ইঙ্গিত দিয়েছে কমিটি। ৩ এপ্রিলের তদন্ত প্রতিবেদন এবং ১০ এপ্রিলের মধ্যে আবাসন বরাদ্দের এই ‘ডেডলাইন’ সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে। ত্রয়োদশ সংসদের শুরুতেই এমন তদন্ত কমিটি গঠন নজিরবিহীন না হলেও, নিরাপত্তার খাতিরে একে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

