দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নিয়ে কোনো ধরনের অবমূল্যায়ন বা বিকৃতি বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে বিএনপি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা হবে—এটিই স্বাভাবিক। তবে এই গবেষণার আড়ালে এমন কোনো মন্তব্য বা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো উচিত নয়, যা দেশের মূল ভিত্তি এবং ইতিহাসের সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠ চর্চা জরুরি, কিন্তু তার নামে অবমূল্যায়ন গ্রহণযোগ্য নয়।
অতীত ও ভবিষ্যতের ভারসাম্য রক্ষা করার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী এক গভীর জীবনদর্শনের অবতারণা করেন। তিনি বলেন, “অতীত নিয়ে সারাক্ষণ পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ হয়ে যায়, আর অতীতকে পুরোপুরি ভুলে গেলে দুই চোখই অন্ধ হয়ে যায়।” তিনি মনে করেন, আমাদের শিকড়কে ভুলে থাকা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি অতীতকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধের স্থপতিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ জাতীয় নেতাদের, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আহত ও পঙ্গু বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের সাহসিকতার কথা পরম মমতায় স্মরণ করেন।
শহীদ জিয়ার ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তাই ছিলেন না, তিনি হৃদয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন লালন করতেন। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত তার ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক নিবন্ধটি এর বড় প্রমাণ। সেখানে তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে স্বাধীনতার ঘোষণার মুহূর্তটি বর্ণনা করেছেন, যা আজও গবেষকদের জন্য এক অমূল্য দলিল।
তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একার সম্পদ নয়, এটি ছিল একটি প্রকৃত ‘জনযুদ্ধ’। দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও যদি জাতি হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি, তবে একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা মোটেও অসম্ভব নয়।
বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপগুলোর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক এই সরকার কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং খাল খননের মতো কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করছে। এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ভালো থাকাই হওয়া উচিত এবারের স্বাধীনতা দিবসের মূল অঙ্গীকার।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী ও বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা। তরুণ প্রজন্মের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উদাত্ত আহ্বান ছিল—সবাই মিলে একটি সুন্দর ও সুখী সমাজ গড়ে তোলার শপথ নেওয়া।

