মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার মাঝেই বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে আসছে তিন বিশালকার এলএনজি ট্যাংকার। আগামী পাঁচ দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে যাচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গতি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, আমদানিকৃত এই এলএনজি নিয়ে তিনটি আলাদা জাহাজ সমুদ্রসীমার পথে রয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ ইতিমধেই বাংলাদেশের জলসীমায় নোঙর করেছে। বাকি দুটি জাহাজ আগামী বুধবারের মধ্যে কুতুবদিয়া উপকূলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তিনটি জাহাজ মিলিয়ে মোট গ্যাসের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার মেট্রিক টন।
অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ‘এইচএল পাফিন’ নামক একটি বিশালাকার ট্যাংকার ৬১ হাজার ৯৯৭ টন এলএনজি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার কুতুবদিয়া উপকূলে এসে পৌঁছেছে। এটি বর্তমানে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা এই জাহাজটি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে আসন্ন গ্রীষ্মে গ্যাসের সম্ভাব্য ঘাটতি মেটানোর প্রাথমিক ধাপ শুরু হলো।
একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকেও দুটি জাহাজ বাংলাদেশের অভিমুখে রওনা দিয়েছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬১ হাজার টন এলএনজি নিয়ে আসছে ‘নিউ ব্রেভ’ নামক জাহাজটি। অন্যদিকে, সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৭০ হাজার টন গ্যাস বহনকারী ‘সেলসিয়াস গ্যালাপাগোস’ ট্যাংকারটিও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বুধবারের মধ্যে বন্দরে ভেড়ার কথা রয়েছে।
এই দুটি জাহাজের স্থানীয় শিপিং এজেন্ট ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আলম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। বর্তমান সমুদ্র পরিস্থিতি এবং জাহাজের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে তারা আশা করছেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিঘ্ন ছাড়াই ট্যাংকার দুটি সঠিক সময়ে কুতুবদিয়া উপকূলে পৌঁছাতে পারবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে এই পরিমাণ গ্যাস আসা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দেশের সার কারখানা এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের তীব্র চাহিদা থাকায় এই আমদানি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এই তিন জাহাজের আগমন সেই শঙ্কাকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই ব্যস্ততা নির্দেশ করছে যে, সরকার ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানির উৎসগুলোকে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে গ্যাস আসায় একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা কমছে। এটি জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজগুলো কুতুবদিয়া উপকূলে পৌঁছানোর পর ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) মাধ্যমে গ্যাস রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে যাতে কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ ছাড়াই দ্রুততম সময়ে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
গ্যাসের এই নতুন চালান আসার সংবাদে দেশের শিল্পমালিকদের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। নতুন এই গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হলে সেই সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন। তবে দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় এই পরিমাণ যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

