রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে শুরু করেছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে উঠে এসেছে স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং ঝুট ব্যবসা ও ফুটপাথ থেকে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণের লড়াই। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) জানিয়েছে, এই কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নিয়েছিল ছয় থেকে সাতজন, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল কিবরিয়াকে রাজনৈতিক পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া।
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দুই দুর্ধর্ষ শ্যুটারকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—মো. রাশেদ ওরফে লোপন (৩৫) এবং মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লু (৪০)। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি রিভলবার ও তিন রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে র্যাব-৪ এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৪ এর কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহাবুদ্দিন কবির জানান, গ্রেপ্তার হওয়া এই দুই শ্যুটার ঘটনার পর থেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। তারা অবৈধ পথে সীমান্ত পার হতে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে বৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরির চেষ্টা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর রূপনগর ও উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তে জানা গেছে, গত বছরের ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় মিরপুর ১২ নম্বরের একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে ঢুকে অত্যন্ত কাছ থেকে কিবরিয়াকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। কিলিং মিশনে সরাসরি তিনজন শ্যুটার অংশ নিয়েছিল, যাদের মধ্যে জনি নামে একজন আগেই ধরা পড়েছিল। বাকি দুজন ছিলেন এই লোপন ও কাল্লু। লোপন স্বীকার করেছেন যে, তিনি নিজে দুই রাউন্ড গুলি কিবরিয়ার শরীরে বিদ্ধ করেন এবং এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেন।
র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে এই হত্যার মূল মোটিভ। নিহত গোলাম কিবরিয়া পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তার ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব স্থানীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান মশির অপরাধ সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে মিরপুর এলাকার ঝুট ব্যবসা, হাউজিং সেক্টর এবং ফুটপাথের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কিবরিয়া বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাবুদ্দিন কবির আরও জানান, এই সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে প্রত্যেকের আলাদা দায়িত্ব ছিল। ‘ভাগিনা মাসুম’ নামে একজন শ্যুটারদের অস্ত্র সরবরাহ ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল। অন্যদিকে ‘পাতা সোহেল’ অস্ত্র ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করত এবং সুজন নামে একজন কিবরিয়ার গতিবিধি নজরদারি করত। এই পুরো চক্রটি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় কিবরিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষেছিল।
উল্লেখ্য, হত্যাকাণ্ডের দিন পালিয়ে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা একটি অটোরিকশায় ওঠে। চালক দ্রুত গাড়ি না চালানোয় তাকেও গুলি করে আহত করা হয়েছিল। ঘটনার পর কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার দীনা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটিতে পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও সাত-আটজনকে আসামি করা হয়েছিল।
র্যাব কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই গ্রেপ্তারের ফলে মিরপুর এলাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে। রাজনৈতিক লেবাসের আড়ালে যারা চাঁদাবাজি ও খুনের রাজনীতি পরিচালনা করছে, তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই মিশনের মাস্টারমাইন্ড এবং অন্যান্য সহযোগীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

