আজ ২৬শে মার্চ। বাঙালির ইতিহাসের সেই মহত্তম দিন, যখন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে এক অদম্য জাতি তার আত্মপরিচয়ের ঘোষণা দিয়েছিল। আজ ৫৬তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ আর অকুতোভয় বীরত্বের স্মৃতি বুকে নিয়ে বাংলাদেশ আজ উদযাপন করছে তার গৌরবের এই মাইলফলক।
ভোরের আলো ফোটার আগেই সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করে জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত করছে তাদের সামনে, যাদের রক্তের বিনিময়ে এই ভূখণ্ডে উদিত হয়েছিল স্বাধীনতার সূর্য। শিশিরভেজা ঘাস আর কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনী পেরিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা লাল-গোলাপের স্তবকগুলো যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে—বাংলাদেশ তার শেকড়কে ভোলেনি।
১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যার মুখে দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতি পাল্টা প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। সেই ইতিহাসের সূচনাপর্ব হিসেবে ২৬শে মার্চ আমাদের অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। এবারের ৫৬তম বার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গ্রহণ করা হয়েছে বর্ণাঢ্য সব কর্মসূচি।
দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসামান্য ত্যাগ আমাদের এক আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ার পথে সাহস জোগায়। সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল স্বাধীনতার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি শোষণমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্য অর্জনে দল-মত নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশপ্রেম ও সহমর্মিতার কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।
বৃহস্পতিবার প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের শুভ সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি সব ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাদের পর বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ কুচকাওয়াজ ও ফ্লাই পাস্ট। আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন আর মাটিতে সামরিক বাহিনীর সুশৃঙ্খল মার্চ পাস্ট দর্শকদের মধ্যে এক অন্যরকম শিহরণ জাগিয়ে তোলে। অনুষ্ঠানটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল, যা উৎসবে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
আজকের দিনটি উপলক্ষে সারাদেশে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়েছে। হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানাগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিসি’র বিভিন্ন ঘাটে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের যুদ্ধজাহাজগুলো জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের নৌ-ইতিহাস তুলে ধরছে।
দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কুচকাওয়াজ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার সিনেমা হলগুলোতে বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। এই আয়োজনগুলো কেবল উৎসব নয়, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে একাত্তরের চেতনা পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ সচিবালয়ে ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেছেন। প্রযুক্তির এই যুগেও ডাকটিকিটের এই স্মারক ইতিহাস সংরক্ষণে একটি প্রতীকী ভূমিকা পালন করে। জাতীয় এই উৎসবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও লাল-সবুজের প্রোফাইল পিকচার আর দেশপ্রেমের বার্তায় মুখর হয়ে উঠেছে।
সাভারের স্মৃতিসৌধের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা আজহার আলী তার স্মৃতির ঝুলি খুলে বসলেন। তার কথায় উঠে এলো সেই দিনগুলোর কথা, যখন হাতে অস্ত্র আর বুকে অদম্য সাহস নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শত্রুর ওপর। তিনি বললেন, “আমরা রক্ত দিয়ে এই দেশ এনেছি যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। আজকের এই উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয় আমাদের ত্যাগ বিফলে যায়নি।”
শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আজ দেশের প্রতিটি মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। বিকেলের দিকে জাতীয় স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন স্থানে ফুটবল ও কাবাডি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। গ্রামীণ জনপদেও মেলা ও জারি-সারির আসর বসার খবর পাওয়া গেছে।
বিদেশের মাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হচ্ছে। প্রবাসীরা লাল-সবুজ পোশাকে সজ্জিত হয়ে দেশীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতি তুলে ধরছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ৫৬ বছরের এই যাত্রায় বাংলাদেশ অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার এই চেতনা আমাদের আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়।
উৎসবের এই আবহে একটি সুরই বারবার বেজে উঠছে—স্বাধীনতাকে রক্ষা করা তার অর্জনের চেয়েও কঠিন। আজ বীর শহীদদের স্মৃতির মিনারে যে ফুলের স্তবকগুলো জমছে, তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমের শপথ হয়। ৫৬ বছর আগে যে প্রতিজ্ঞায় বাঙালি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, সেই সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ গড়ার কাজ এখনো চলমান।
সাভারের স্মৃতিসৌধ থেকে আসা প্রতিটি মানুষ যখন ফিরে যাচ্ছেন, তাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের পরিচয়। মনে করিয়ে দেয় সেই লাখো প্রাণের কথা, যারা একটি মানচিত্রের জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। ২৬শে মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি প্রতিটি বাঙালির হৃদস্পন্দন।

