কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে চলন্ত বাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় উঠে এসেছে দায়িত্ব পালনে চরম গাফিলতির প্রমাণ। র্যাব জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত দুই গেটম্যানের একজনও উপস্থিত ছিলেন না। তাদের এই অনুপস্থিতিই এক ডজন মানুষের অকাল মৃত্যুর মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি ও গেটম্যান মো. হেলালকে (৪১) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১১। বুধবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য জানান র্যাব-১১-এর উপ-অধিনায়ক লে. কমান্ডার মো. নাঈম উল হক।
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২২ মার্চ রাত ৩টা ১০ মিনিটে। গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, তখন সদর দক্ষিণ মডেল থানাধীন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের নিচের রেলক্রসিং দিয়ে পার হচ্ছিল যশোর থেকে লক্ষ্মীপুরগামী ‘মামুন স্পেশাল’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস। রেলক্রসিংয়ের গেট খোলা থাকায় চালক বাসটি নিয়ে লাইনের ওপর উঠে পড়েন। ঠিক সেই মুহূর্তেই ধেয়ে আসা ট্রেনের ধাক্কায় বাসটি দুমড়েমুচড়ে যায়।
র্যাব জানায়, গেটম্যানদের নিয়ম অনুযায়ী ট্রেনের সংকেত পাওয়ার সাথে সাথে গেট নামিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার কথা। কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনার সময় অভিযুক্ত হেলাল ও তার সহযোগী মেহেদী হাসান কেউই সেখানে ছিলেন না। ফলে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা লাল সংকেত না দেখেই বাসটি লাইনে উঠে পড়ে। এই ভয়াবহ সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর মোট ১২ জন প্রাণ হারান, আর আহত হন অন্তত ২৫ জন।
দুর্ঘটনার পরপরই দুই গেটম্যান এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। তবে ছায়াতদন্ত চালিয়ে র্যাব-১১ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার বুড়িচং থানার শংকুচাইল এলাকা থেকে হেলালকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। মামলার এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি হেলাল এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তা নাঈম উল হক বলেন, “একজন গেটম্যানের সামান্য অবহেলা কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, এটি তার জ্বলন্ত উদাহরণ। জনগণের নিরাপত্তার বদলে তারা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো কর্মস্থল ত্যাগ করেছিলেন।” গ্রেপ্তার হওয়া হেলালকে এখন লাকসাম রেলওয়ে থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে, এই ঘটনায় নিহত সোহেল রানা নামে এক যাত্রীর স্বজন বাদী হয়ে লাকসাম রেলওয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় দুই গেটম্যানকেই সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। পলাতক থাকা অন্য আসামি মেহেদী হাসানকে ধরতে র্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারি আর পডুয়ার বাজারের সেই ধ্বংসস্তূপ এখনো মানুষের মনে ভয়ের আবহ তৈরি করে রেখেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যানে যখন সড়কে মৃত্যুর মিছিল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন রেলক্রসিংয়ের এমন অব্যবস্থাপনা নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

