দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গত কয়েক বছর ধরে চলে আসা স্কুলে ভর্তির ‘লটারি প্রথা’ চূড়ান্তভাবে বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে, অর্থাৎ সরাসরি ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতেই স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।
সোমবার (১৬ মার্চ) বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং প্রকৃত মেধাবীদের মূল্যায়ন করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। লটারি পদ্ধতিতে অনেক সময় যোগ্য শিক্ষার্থীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল, যা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষক মহলে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছিল।
শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “লটারি একটি ভাগ্যনির্ভর প্রক্রিয়া ছিল, কিন্তু শিক্ষা হওয়া উচিত সাধনা ও যোগ্যতার বিষয়। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে বড় হোক। পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করার ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা ফিরে আসবে।” তিনি আরও জানান, এই সিদ্ধান্ত চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বিগত বছরগুলোতে করোনা মহামারীর প্রেক্ষাপটে এবং ভর্তি বাণিজ্য ও তদবির বন্ধের যুক্তিতে লটারি প্রথা চালু করা হয়েছিল। তবে লটারিতে নাম না আসায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী নামী স্কুলগুলোতে ভর্তির সুযোগ হারাত, যা তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলত বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। অভিভাবক মহলের একটি বড় অংশও দীর্ঘদিন ধরে মেধার ভিত্তিতে ভর্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি পরীক্ষার কাঠামো কেমন হবে এবং কত নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে দ্রুতই একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জারি করা হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক—উভয় স্তরেই এই নতুন নিয়ম কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত গাইডলাইন শিগগিরই প্রকাশ করবে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর। তবে শিক্ষামন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, পরীক্ষা পদ্ধতি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত কোচিং বা মানসিক চাপ সৃষ্টি না হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আরও জানান, এই পরিবর্তনের ফলে স্কুলগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে এবং ডিজিটাল জালিয়াতির সুযোগ কমবে। সরকার চায় প্রতিটি শিক্ষার্থী তার মেধা ও পরিশ্রমের ফল হিসেবে সেরা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাক। লটারি বাতিলের এই ঘোষণা আসার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্কুলগুলোর শিক্ষার মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এক ধরনের তাগিদ তৈরি হবে। অন্যদিকে, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা বা বিশেষ কোনো ব্যবস্থা থাকবে কি না, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী নীতিমালায় স্পষ্ট করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যেই এই সাহসী পদক্ষেপ নিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

