দেশের সমুদ্র অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান দুই প্রবেশদ্বার—চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বন্দর কর্তৃপক্ষ ছাড়াও বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বিতর্কিত চুক্তি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি এখন দুদকের আতশিকাঁচের নিচে।
রোববার বিকেলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে নিয়ে ইতোমধ্যে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। সংস্থাটি মনে করছে, এসব প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে চলা কাঠামোগত অনিয়ম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতার কারণে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অনুসন্ধানের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের আলোচিত জাহাজ ক্রয় প্রকল্প। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি জাহাজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটেছে। বাজারমূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি দামে জাহাজ কেনা এবং কারিগরি স্পেসিফিকেশনে গরমিলের মাধ্যমে কয়েকশ কোটি টাকা তছরুপের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানা গেছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শুধু জাহাজ ক্রয় নয়, বরং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের ড্রেজিং প্রকল্প, জেটি নির্মাণ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের কাজেও অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে। বিশেষ করে প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজ শেষ না করেই চূড়ান্ত বিল তুলে নেওয়ার মতো গুরুতর বিষয়গুলো এখন তদন্তাধীন।
দুদকের অনুসন্ধান টিমের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তারা কেবল প্রকল্পের কাগজপত্রের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না। বন্দর ও শিপিং কর্পোরেশনের পদস্থ কর্মকর্তাদের আয় এবং ব্যয়ের হিসাবও মেলানো হবে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পগুলো থেকে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে এবং দেশে নামে-বেনামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে বড় বড় প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নামে যেভাবে খরচ দেখানো হয়েছে, তার সাথে বাস্তব কাজের কতটুকু মিল রয়েছে—তা সরেজমিনে পরীক্ষা করবে এই তদন্ত দল। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় কেনা সরঞ্জামের মান ও দাম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ, যা এখন দুদকের ফাইলের অন্তর্ভুক্ত।
জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বলেন, “আমরা একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র তলব করা হবে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
দেশের অর্থনীতির এই লাইফলাইনগুলোতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে দুদকের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্দরগুলোতে যদি দুর্নীতির অবসান ঘটে, তবে আমদানি-রপ্তানি খরচ কমার পাশাপাশি দেশের রাজস্ব আয়ও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, দুদকের এই বিশেষ টিম কত দ্রুত রাঘববোয়ালদের শনাক্ত করতে পারে।

