বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন যে, জনগণের দেওয়া রায় প্রতিফলিত হওয়ার পর নখের কালি শুকানোর আগেই তার সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার পূরণে কাজ শুরু করে দিয়েছে। শনিবার (১৪ মার্চ) রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য বিশেষ সম্মানী ভাতা প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন যে, তার সরকারের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। তিনি বিশ্বাস করেন, নাগরিকদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রেখে একটি রাষ্ট্র কখনোই শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না। এই দর্শন থেকেই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য একের পর এক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে।
শনিবারের এই অনুষ্ঠানটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক মিলনমেলা। সেখানে কেবল মসজিদের ইমাম, খতিব বা মুয়াজ্জিনরাই উপস্থিত ছিলেন না; বরং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসেছিলেন হিন্দু ধর্মের পুরোহিত ও সেবায়েত, বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং খ্রিস্টান ধর্মযাজকগণ। প্রধানমন্ত্রী তাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা সমাজের এমন এক স্তরের মানুষ, যাদের সাধারণ মানুষ কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই শ্রদ্ধা করে এবং জীবনের কঠিন সময়ে উপদেশের জন্য আপনাদের দ্বারে ছুটে আসে।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মসজিদ রয়েছে। এই বিশাল নেটওয়ার্ককে কেবল ইবাদতের স্থান হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম ‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার সরকার ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা’ কার্যক্রম চালু করেছিল। বর্তমান সরকার সেই ধারাকে আরও আধুনিক ও বিস্তৃত করতে চায়।
আর্থিক সহায়তার বিস্তারিত তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ৪,৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির এবং ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহারের প্রায় ১৭ হাজার ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে মাসিক সম্মানী ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। তবে এটি কেবল শুরু। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এই সহায়তার আওতায় আসবেন। সরকার চায় না কোনো ধর্মীয় নেতা তার মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাক।
তবে কেবল ভাতা প্রদানই শেষ কথা নয়। তারেক রহমান ইমাম ও ধর্মীয় গুরুদের সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি ঘোষণা করেন, এখন থেকে প্রতিটি জেলার আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় একজন করে ধর্মীয় প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে সামাজিক অপরাধ রোধ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ধর্মীয় নেতাদের অভিজ্ঞতা ও প্রভাবকে রাষ্ট্রীয় কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে আসন্ন অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পেরও একটি রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের জন্য ইতিমধ্যেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে, যা ধাপে ধাপে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে আগামী ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ থেকে চালু হচ্ছে বহুল প্রতিক্ষিত ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা ‘কৃষক কার্ড’। এছাড়া ১৬ মার্চ থেকে দিনাজপুর জেলা থেকে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হতে যাচ্ছে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও যদি মানুষের মধ্যে ধৈর্য, সততা, কৃতজ্ঞতাবোধ এবং সহনশীলতা না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। তিনি পবিত্র হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, যার আমানতদারি নেই, তার ইমান নেই; আর যার প্রতিশ্রুতি ঠিক নেই, তার ধর্ম নেই। প্রতিহিংসামুক্ত সমাজ গড়তে ধর্মের এই উদার বাণীগুলো প্রচার করা এখন সময়ের দাবি।
তারেক রহমান সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, অতীতে দেশ যেভাবে ফ্যাসিবাদ বা তাবেদার শক্তির খপ্পরে পড়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে জনগণের ক্ষমতায়ন জরুরি। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি নাগরিকদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করলে বাংলাদেশ দ্রুততম সময়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে।
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র তার সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু ব্যবহার করবে। ভোটের সময় দেওয়া প্রতিটি কথা যে কেবল নির্বাচনী বুলি ছিল না, বরং একটি সুপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনা ছিল—তারই প্রমাণ দিতে চায় বর্তমান প্রশাসন।

