ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ এক আবেগঘন পরিবেশে রূপ নেয়, যখন প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শুরু হয়। সংসদ সদস্য ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বক্তব্যে বেগম জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীন গণতন্ত্র এবং সার্বভৌমত্বের ‘অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে অভিহিত করেন।
বৃহস্পতিবার বিকালের অধিবেশনে স্পিকারের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, “বাংলাদেশের ৪৩ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কোনো বাঁক নেই যেখানে বেগম জিয়ার সাহসিকতার ছাপ পড়েনি। তিনি গণতন্ত্রের প্রশ্নে, দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনো কারও কাছে মাথা নত করেননি। আজ আমরা যে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল তার দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।”
বক্তব্যের শুরুতেই মির্জা ফখরুল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লবে প্রাণদানকারী তরুণদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “আমাদের সন্তানরা একটি বৈষম্যহীন এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে রক্ত দিয়েছে। এই রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। এই সংসদ হবে সেই শহীদদের স্বপ্নের প্রতিফলন।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শাসন আমলের যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো স্মরণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশে নারী শিক্ষার প্রসারে বেগম জিয়া যে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, তা আজও দক্ষিণ এশিয়ায় উদাহরণ। মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা এবং প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার সাহসী সিদ্ধান্তগুলোই আজ আমাদের শিক্ষিত নারী সমাজ উপহার দিয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, উচ্চশিক্ষার দুয়ার সবার জন্য উন্মুক্ত করতে জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বেসরকারি খাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনুমতি দিয়ে তিনি শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিকায়নের সূচনা করেছিলেন। এগুলো কেবল নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং একটি জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বেগম জিয়ার অবদানের কথা তুলে ধরে ফখরুল বলেন, “তিনি জানতেন কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই কৃষকদের ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মকুফ এবং ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ করে দিয়ে তিনি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশকে হাঁটিয়ে তিনি একটি স্বনির্ভর অর্থনীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন।”
মির্জা ফখরুল অত্যন্ত আবেগজড়িত কণ্ঠে স্মরণ করেন বেগম জিয়ার কারামুক্তির পরবর্তী দিনগুলোর কথা। তিনি বলেন, বছরের পর বছর অন্যায্য কারাবাস এবং অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করার পরও বেগম জিয়ার মনে কোনো প্রতিহিংসা ছিল না। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি বলেছিলেন— ‘আসুন, আমরা প্রতিহিংসা ভুলে একটি ভালোবাসার বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’
বিএনপি মহাসচিব স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “বেগম জিয়ার সেই উদারতা এবং ঐক্যের দর্শনই আমাদের আগামীর পথচলার প্রধান পাথেয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে দেশ গড়তে হয়। আজ এই সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা শপথ নিচ্ছি, তার দেখানো সেই গণতান্ত্রিক পথ থেকে আমরা বিচ্যুত হবো না।”
অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত সদস্যরা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের এই স্মৃতিচারণ শোনেন। অনেক নতুন সদস্যকে দেখা গেছে ডায়েরিতে এই পয়েন্টগুলো নোট করে নিতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্যের মাধ্যমে বেগম জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তার উন্নয়ন দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি চেষ্টা করা হয়েছে।
বিকেলের এই অধিবেশনে এক বিষণ্ণ অথচ সংকল্পবদ্ধ পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। শোক প্রস্তাবের এই আলোচনা কেবল একজন নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের একটি ঐতিহাসিক কালখণ্ডকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ।

