দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অচলায়তন, দুঃশাসন আর রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এক নতুন সূর্যোদয়ের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছে আজ। প্রথম অধিবেশনের প্রারম্ভেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক আবেগঘন ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছেন—এখন থেকে জাতীয় সংসদই হবে দেশের সব যুক্তি-তর্ক ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে সংসদ কক্ষে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী যখন তার বক্তব্য শুরু করেন, তখন পুরো অধিবেশনে এক গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছিল। তিনি বলেন, “আমরা আজ যে সংসদীয় কাঠামোয় দাঁড়িয়ে কথা বলছি, তার প্রতিটি ইট-পাথরে মিশে আছে হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ। ফ্যাসিবাদের নির্মম শিকল ভেঙে এই দায়বদ্ধ সংসদ পেতে আমাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।”
বক্তৃতার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া প্রতিটি প্রাণকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন সেইসব মানুষদের কথা, যারা গত ১৫ বছরে গুম, খুন এবং কুখ্যাত ‘আয়নাঘরে’ অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের সাহসিকতা আর বিসর্জনের বিনিময়েই দেশে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম হয়েছে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন।
সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, “দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। অথচ বিগত শাসনামলে এই পবিত্র সংসদকে এক জঘন্য প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল। তিনি আজীবন আপসহীন লড়াই করেছেন, কিন্তু আজকের এই শুভ মুহূর্তটি সশরীরে দেখে যেতে পারেননি। তার অভাব আমরা প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করছি।”
বক্তব্যে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কালজয়ী উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, “জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তবে আমি সেই দলেই আছি।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ব্যক্তি বা দলের চেয়ে জনগণের স্বার্থ বড়—এটাই বর্তমান সরকারের মূল দর্শন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করেন।
সংসদের বর্তমান বিশেষ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা কঠোর সুরেই বলেন, “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে, সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারদের কাউকেও আজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা হয় দুর্নীতির দায়ে কারাগারে, না হয় জনরোষ থেকে বাঁচতে পলাতক। এটি একটি নজিরবিহীন সংকট।”
এই সংকটকালীন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি জানান, ১৯৭৩ সালেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান প্রবীণ নেতা মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এবং বর্তমান আইনি শূন্যতা পূরণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দল ও সকল সংসদ সদস্যের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে, আদর্শিক মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু একটি সার্বভৌম, নিরাপদ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নে আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকা উচিত নয়।” তিনি প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
সংসদ কক্ষের ভেতরে তখন পিনপতন নীরবতা। নবাগত সংসদ সদস্যদের চোখে ছিল আগামীর স্বপ্ন আর অভিজ্ঞদের চোখে ছিল স্বস্তি। প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছিল না, বরং এটি ছিল আগামীর বাংলাদেশের একটি রূপরেখা। যেখানে জবাবদিহিতা থাকবে, আর থাকবে জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের এই বক্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার যে, সরকার সংসদকে কার্যকর করতে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বাইরে এসে রাজনৈতিকভাবে দেশ পরিচালনায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দীর্ঘ সময় পর সংসদীয় বিতর্কের মধ্য দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষা পাবে—এমনটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। অধিবেশনের প্রথম দিনেই এই সংকল্প জনগণের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

