বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক পেরোলো আজ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। অভিজ্ঞ এই রাজনীতিকের হাতে সংসদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হলো রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গের নতুন পথচলা।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার ঠিক পরেই শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনে শুরু হয় ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম ঐতিহাসিক অধিবেশন। অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেন সংসদের প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এক গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে তিনি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেন।
সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন অধিবেশনকক্ষে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের জানান, স্পিকার পদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেবলমাত্র একটিই মনোনয়ন জমা পড়েছে। সেই মনোনয়নটি ছিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামে। একক প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি ছিল সংক্ষিপ্ত এবং সুশৃঙ্খল।
সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, একক প্রার্থী হওয়ার কারণে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এর পরপরই সংসদীয় সচিবালয় ও উপস্থিত সদস্যদের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে অধিবেশন কক্ষ। দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ব্যক্তিত্ব এখন থেকে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী অধিবেশন পরিচালনা করবেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদের এই নির্বাচনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি স্থিতিশীল সংসদীয় ব্যবস্থার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। দেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর ত্রয়োদশ সংসদের ওপর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। আর সেই ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে একজন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধার স্থান পাওয়া বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
অধিবেশনের শুরুতে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যখন নাম ঘোষণা করছিলেন, তখন পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল গ্যালারিতে। হাফিজ উদ্দিন আহমদের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন তাকে সব মহলেই গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং স্পষ্টবাদিতা সংসদীয় বিতর্কগুলোকে আরও প্রাণবন্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্পিকার নির্বাচনের এই পর্যায়টি শেষ হওয়ার পর নবনির্বাচিত স্পিকারকে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ গ্রহণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য রক্ষায় স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে আইন প্রণয়ন এবং সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের কণ্ঠস্বরকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া তার প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি।
জাতীয় সংসদের এই প্রথম অধিবেশনে নতুন ও পুরনো সদস্যদের এক মেলবন্ধন দেখা গেছে। অনেক তরুণ মুখ এবার সংসদে এসেছেন, যাদের জন্য হাফিজ উদ্দিন আহমদের মতো একজন অভিজ্ঞ স্পিকারের দিকনির্দেশনা অত্যন্ত জরুরি। সংসদ কক্ষের ভেতরে থাকা সদস্যদের চোখে-মুখে ছিল দেশ পুনর্গঠনের এক সংকল্প।
উল্লেখ্য যে, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ কেবল একজন রাজনীতিবিদই নন, তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত। তার এই দীর্ঘ ত্যাগের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সংসদীয় সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। জনগণের ভোটাধিকারে নির্বাচিত এই সংসদ কতটুকু ফলপ্রসূ হয়, তা এখন সময়ের দাবি।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, স্পিকার নির্বাচনের পর পরবর্তী কার্যসূচি অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ও অন্যান্য সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথম দিনের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জোরদার। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরনের স্বস্তি দেখা গেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে হাফিজ উদ্দিন আহমদের একটি আলাদা ভাবমূর্তি রয়েছে। তিনি বরাবরই নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার পক্ষে কথা বলে এসেছেন। সংসদের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সংসদ সদস্যদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবেন বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে।
আজকের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের সুর শোনা যাচ্ছে, তা কতদূর এগোবে সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার হাত ধরে ত্রয়োদশ সংসদের এই যাত্রা শুরু হওয়াকে গণতন্ত্রকামী মানুষেরা ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছেন।
অধিবেশনের বাকি সময়টুকুতে জনগুরুত্বপূর্ণ নানা ইস্যুতে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন স্পিকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংসদকে কেবল আইন পাসের যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং জনগণের প্রকৃত সমস্যার কথা বলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা। আজ থেকে সেই দীর্ঘ সফরের শুভ সূচনা হলো।

