বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার এক নতুন নজির স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে এক জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে এই প্রকল্পের সূচনা হয়।
কড়াইল বস্তি সংলগ্ন এই ঐতিহাসিক ময়দানে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, পর্যায়ক্রমে দেশের চার কোটি পরিবারের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে এই কার্ড। এটি কেবল একটি প্লাস্টিকের কার্ড নয়, বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার এক নতুন সেতুবন্ধন। উদ্বোধনী দিনে কড়াইল, ভাসানটেক এবং সাততলা এলাকার ১৫ হাজার সুবিধাবঞ্চিত নারীর হাতে এই কার্ডের সুবিধা তুলে দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমরা একটি দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি। নির্বাচনের আগে আমরা কথা দিয়েছিলাম, সরকার গঠন করতে পারলে আমরা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভাব মেটাতে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে আসব। আজ ক্ষমতায় আসার ৩০ দিন পার হওয়ার আগেই আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার পথে প্রথম কদমটি ফেললাম।”
অনুষ্ঠানে ১৭টি পরিবারের নারী প্রধানদের হাতে ব্যক্তিগতভাবে কার্ডের রেপ্লিকা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নিজেই।
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন যে, এই সরকার কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নয়, বরং সাধারণ মানুষের। তিনি বলেন, “জনগণ আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, তাই আমাদের প্রতিটি কাজের হিসাব জনগণের কাছে দিতে আমরা বাধ্য। আমরা দেখিয়ে দিতে চাই যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুততম সময়ে জনকল্যাণমূলক কাজ শুরু করা সম্ভব।”
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর যে চাপের সৃষ্টি হয়েছে, তা লাঘব করাই এই ফ্যামিলি কার্ডের মূল লক্ষ্য। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় এই সেবা পৌঁছে যাবে।
এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার ইতিমধ্যে প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে একটি শক্তিশালী যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটিগুলো প্রকৃত অভাবী মানুষকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব পালন করছে। প্রধানমন্ত্রীর মতে, তথ্যের নির্ভুলতা ও বিতরণে স্বচ্ছতাই হবে এই প্রকল্পের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বড় সুখবর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেন, “আগামী মাসের মধ্যেই আমরা দেশের কৃষক ভাইদের হাতে ‘কৃষি কার্ড’ তুলে দিতে পারব। আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল কৃষকের পাশে দাঁড়ানো, এবং আমরা তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।” কৃষকদের স্বস্তি দিতে গত সপ্তাহেই সরকার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ ও তার সুদ মওকুফের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে।
তারেক রহমান যখন তাঁর এই সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরছিলেন, তখন উপস্থিত কূটনীতিক ও উন্নয়ন সহযোগীদের মাঝেও এক ধরনের ইতিবাচক সাড়া লক্ষ্য করা গেছে। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বাংলাদেশের এই ত্বরিত সামাজিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে দেশের শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতার গুরুত্ব। তিনি বলেন, “বহু বছর পর দেশে একটি সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সরকার আপনাদের অভাব বুঝতে পারে কারণ এটি আপনাদেরই সৃষ্টি। আমরা শুধু শাসক নই, আমরা আপনাদের সেবক হিসেবে কাজ করতে এসেছি।”
কড়াইল বস্তির নারী কার্ডধারী মরিয়ম বেগম তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “আমরা ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি কার্ড পাব। নির্বাচনের সময় অনেক কথাই শুনি, কিন্তু এবার দেখছি প্রধানমন্ত্রী যা বলছেন, তা হাতে কলমে করে দেখাচ্ছেন।” এই সাধারণ মানুষের চোখেমুখের তৃপ্তিই যেন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সার্থকতা ফুটিয়ে তুলছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। কিন্তু তারেক রহমান সরকারের এই গতিশীলতা প্রমাণ করে যে, তারা তৃণমূল পর্যায়ে কাজের পরিধি বাড়াতে মরিয়া। বিশেষ করে নারীদের এই প্রকল্পের কেন্দ্রে রাখা নারী ক্ষমতায়ন ও পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শেষ করেন এক দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। তিনি বলেন, “আজকের দিনটি আমার কাছে শুধু খুশির নয়, বরং এক গভীর আবেগের। আমরা দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু করেছি, ফ্যামিলি কার্ড হবে সেই যুদ্ধের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। আমি চাই না বাংলাদেশের একটি পরিবারও না খেয়ে থাকুক বা চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাক।”
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রতিটি কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে এবং নির্দিষ্ট আর্থিক সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। এর ফলে বাজার দরের ঊর্ধ্বগতি থেকে নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সরকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে আশ্বস্ত করা হয়।
রাজধানীর এই বস্তি এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনে এবং সরাসরি সুবিধা পাওয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে এক ধরনের মালিকানাবোধ তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই কার্ডের বিতরণ ব্যবস্থা দলীয় প্রভাবমুক্ত ও শতভাগ স্বচ্ছ রাখা যায়, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল সামাজিক সুরক্ষা মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই উদ্যোগ কেবল একটি সরকারি কর্মসূচি নয়, বরং এটি তাঁর নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। যেখানে উন্নয়নের সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে পৌঁছাবে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্বোধনের মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের চাহিদাই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

