মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে কামানের গর্জন আর বারুদের গন্ধে যখন বিশ্ববাজার টালমাটাল, তার সরাসরি আঘাত এসে লেগেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাজপথে। একদিকে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের হাহাকার, অন্যদিকে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিরামহীন কর্মতৎপরতা—সব মিলিয়ে এক অস্থির অথচ রূপান্তরের সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ।
চট্টগ্রামের পাম্পে পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লড়াই
শনিবার সকাল থেকেই বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চিত্র ছিল রণক্ষেত্রের চেয়ে কম কিছু নয়। গণি বেকারি মোড় থেকে শুরু করে অলংকার কিংবা বহদ্দারহাট—প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট আর আকাশচুম্বী দাম বাড়ার আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে এক ধরণের ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটার হিড়িক পড়েছে।
সড়ক ছাড়িয়ে তেলের লাইন চলে গেছে অলিগলিতে। চান্দগাঁও এলাকার ট্রাক চালক রহিম মিয়া প্রায় দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর মাত্র কয়েক লিটার তেল পেয়েছেন। তার চোখেমুখে অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, “টিভিতে যুদ্ধের খবর দেখলেই বুক কাঁপে। যদি কাল তেল না পাই, তবে চাকা ঘুরবে না, পেটও চলবে না।” যদিও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বারবার আশ্বস্ত করছে যে মজুত পর্যাপ্ত, কিন্তু সাধারণ মানুষের সংশয় কাটছে না।
রাজধানীর রাজপথে বাইকারদের আর্তনাদ
ঢাকার পরিস্থিতি চট্টগ্রামের চেয়েও ভয়াবহ। রাজধানীর কল্যাণপুর, আসাদগেট আর তেজগাঁওয়ের পাম্পগুলোতে দেখা গেছে হাজারো মোটরবাইকের দীর্ঘ সারি। ব্যবসায়ী আল আমিনের মতো শত শত ভুক্তভোগী আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র দুই লিটার তেল পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন।
সরকার তেল বিক্রিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করায় সাধারণ চালকদের মধ্যে ক্ষোভ তুঙ্গে। তারা বলছেন, মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। রাজধানীর অনেক ছোট পাম্প এরই মধ্যে ‘তেল নেই’ বলে হাত গুটিয়ে নিয়েছে, যার ফলে বড় পাম্পগুলোতে ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ।
ছুটিতেও বিরতিহীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
দেশের এই ক্রান্তিকালে বিশ্রামের সুযোগ নিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শপথ নেওয়ার পর টানা তৃতীয় শনিবারও তিনি তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে অফিস করেছেন। দুপুর ১২টায় কার্যালয়ে এসে তিনি প্রথমেই দেশের পাট শিল্পের পুনর্জাগরণ নিয়ে বিজিআরআই প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তবে বিকেলের বৈঠকে মূল আলোচনার বিষয় ছিল জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন কীভাবে সরবরাহ চেইন ঠিক রেখে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক কমানো যায়। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমিয়ে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় তিনি ওলামা-মাশায়েখ ও এতিমদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নিতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
“সংসদীয় কু-সংস্কৃতি মুছে দেব” – স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
একদিকে যখন রাজপথে তেলের সংকট, অন্যদিকে তখন সংসদীয় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের অঙ্গীকার করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গুলশানে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী দিনে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতীতের ‘সংসদীয় কু-সংস্কৃতি’ আর ফিরতে দেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই এমন এক সংসদ যা দেখে জাতি আশ্বস্ত হবে। অতীতে সংসদে যেসব নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে, সেগুলো মানুষের মন থেকে মুছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।” তিনি নবীন সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা জনপ্রত্যাশা পূরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। একটি শিশুর মতো সতেজ ও সুস্থ সংসদীয় চর্চা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
একটি সংকটের বহুমুখী মোড়
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকার একই সাথে দুটি লড়াই লড়ছে। একদিকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—রাস্তার তেলের লাইন ছোট হবে কি না, আর সংসদের ভেতরে নতুন কোনো আশার আলো দেখা যাবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

