বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ এর জন্য মনোনীতদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং ৫টি প্রতিষ্ঠানকে এই অনন্য মর্যাদায় ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে অবহিত করেন।
এবারের তালিকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর দীর্ঘদিনের আপসহীন সংগ্রাম ও সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণাটি দেশের জাতীয় ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা ক্যাটাগরিতে এ বছর বিশেষ সম্মাননা পাচ্ছে গৌরবময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিলকে মরণোত্তর এই সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে। রণাঙ্গনের বীরদের এই স্বীকৃতি জাতির ঋণ স্বীকারের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস হিসেবে দেখছে সরকার।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনন্য অবদানের জন্য অধ্যাপক ড. জহুরুল করিমের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের চিকিৎসা সেবায় নিরলস ভূমিকার জন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবার স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। করোনাকালীন দুর্যোগ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে।
সাহিত্যের আঙিনায় ড. আশরাফ সিদ্দিকীকে তাঁর মরণোত্তর অবদানের জন্য এই পুরস্কারে ভূষিত করা হচ্ছে। সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে এবার দুজনকে বেছে নেওয়া হয়েছে—জনপ্রিয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এ কে এস হানিফ (হানিফ সংকেত) এবং প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী বশির আহমেদ (মরণোত্তর)। হানিফ সংকেত তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় যে ভূমিকা রেখেছেন, তারই স্বীকৃতি মিলল এই পুরস্কারের মাধ্যমে।
ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশের নাম উজ্জ্বল করায় জোবেরা রহমান লিনুকে এবারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। টেবিল টেনিসে তাঁর গৌরবময় রেকর্ড আজও তরুণ অ্যাথলেটদের অনুপ্রাণিত করে। পল্লী উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনোনীত হয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), যারা প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে।
সমাজসেবা ও জনসেবা বিভাগে এবার বেশ কজন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে তাঁর আজীবনের জনহিতকর কাজের জন্য মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। একই ক্যাটাগরিতে এস ও এস চিলড্রেন্স ভিলেজ ইন্টারন্যাশনাল ইন বাংলাদেশ, সাইদুল হক এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
জনসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য মাহেরীন চৌধুরীকেও মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হবে। এছাড়া জনপ্রশাসনে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখায় পি এইচ ডি কাজী ফজলুর রহমানকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও দক্ষতায় তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে রাখতেই এই উদ্যোগ।
গবেষণা ও প্রশিক্ষণ খাতে এবার তিনজনকে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—মোহাম্মদ আবদুল বাকী, অধ্যাপক ড. এম এ রহিম এবং অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে যারা নিভৃতে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের এই স্বীকৃতি গবেষণার পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাওয়া আবদুল মুকিত মজুমদারকে (মুকিত মজুমদার বাবু) এ বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রকৃতি ও জীবন রক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচার ও কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করেছে সরকার।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সাধারণত প্রতি বছর ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বিজয়ীদের হাতে পদক ও সম্মাননা তুলে দেন। পদকপ্রাপ্তরা একটি স্বর্ণপদক, সম্মাননা সনদ এবং নির্দিষ্ট অংকের চেক পাবেন।
এবারের পুরস্কারের তালিকায় মরণোত্তর সম্মাননার প্রাধান্য দেখা গেছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে যারা দীর্ঘকাল নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন, কিন্তু জীবদ্দশায় হয়তো যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি, তাঁদের খুঁজে বের করে সম্মানিত করার এই প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনরা।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি রাষ্ট্রীয় এই সম্মাননা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আজকের মন্ত্রিসভা বৈঠকে অন্যান্য নিয়মিত এজেন্ডার পাশাপাশি এই তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সম্পন্ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের উন্নয়নে এসব গুণীজন ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
পুরস্কারপ্রাপ্তদের চূড়ান্ত এই তালিকাটি এখন জাতীয় গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে। শীঘ্রই অনুষ্ঠানসূচি ঘোষণা করা হবে যেখানে বিজয়ীদের বা তাঁদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে।

