চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ঘেরা জনপদে সাত বছরের এক শিশুর মৃত্যু কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং উন্মোচন করেছে পারিবারিক জিঘাংসার এক অন্ধকার অধ্যায়। জান্নাতুল নাইমা ইরা নামের সেই শিশুটিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে পুলিশ এখন নিশ্চিত যে, দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধই ছিল এই নির্মমতার মূল কারণ।
মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ইরা। এরপরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। আজ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন নিশ্চিত করেছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত বাবু শেখকে (৪৫) গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে এক রুদ্ধশ্বাস ও বেদনাদায়ক বিবরণ।
ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার সকালে। সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা এলাকায় নিজের বাড়ির পাশেই খেলা করছিল ইরা। পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত বাবু শেখ দীর্ঘদিনের কোনো এক ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর জন্য ওই শিশুকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। শিশুটির সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে চকলেট কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখায় সে।
চকলেটের লোভে ইরা যখন তার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করে, তখন সে জানত না যে এই পথই তার শেষ যাত্রা হতে চলেছে। কুমিরা থেকে একটি বাসে করে তারা সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছায়। সেখান থেকে বাবু শেখ শিশুটিকে নিয়ে পায়ে হেঁটে গভীর পাহাড়ী এলাকার নির্জনতায় ঢুকে পড়ে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে ইরাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় বাবু শেখ। ভয়ে এবং যন্ত্রণায় শিশুটি চিৎকার শুরু করলে ঘাতক আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে নিজের কাছে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সে শিশুটির গলায় আঘাত করে। ইরার নিথর দেহ রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় সে।
তবে ভাগ্যক্রমে ইরা তখনো বেঁচে ছিল। রক্তক্ষরণ আর প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে শিশুটি হামাগুড়ি দিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসতে সক্ষম হয়। একটি নির্মাণাধীন সড়কের কাছে পৌঁছালে কর্মরত শ্রমিকদের নজরে আসে রক্তাক্ত শিশুটি। দুপুর দেড়টার দিকে শ্রমিকরা পুলিশকে খবর দিলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
পুলিশ প্রথমে ইরাকে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু তার জখম ছিল অত্যন্ত গুরুতর। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় যমে-মানুষে টানাটানির পর মঙ্গলবার ভোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ইরা।
এদিকে মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ সীতাকুণ্ডের কুমিরা থেকে শুরু করে পাহাড় পর্যন্ত প্রতিটি সড়কের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। প্রযুক্তির সহায়তায় এবং ফুটেজে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার পর পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, অপরাধী স্থানীয় পরিচিত মুখ বাবু শেখ। আজ দুপুর ১২টার দিকে কুমিরা কাজীপাড়া এলাকা থেকে তাকে পাকড়াও করা হয়।
পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খাঁন জানান, গ্রেফতারের পর বাবু শেখের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাহাড়ের সেই নির্জন স্থান থেকে রক্তমাখা পোশাক ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। পারিবারিক বিরোধের জের ধরে এত ছোট একটি শিশুর ওপর এমন বর্বরতা চালানো হতে পারে, তা ভাবিয়ে তুলছে স্থানীয় সমাজকে।
সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে যখন সূর্য ডুবছে, তখন ইরার বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। যে শিশুটি কয়েকদিন আগেও হেসেখেলে বেড়াত, আজ সে কেবল একটি নিথর দেহ। স্থানীয়রা এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং দোষী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে অভিযুক্ত বাবু শেখকে আদালতে প্রেরণের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, চার্জশিট দ্রুত দাখিল করার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার সব ধরণের ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করছে। একটি তুচ্ছ পারিবারিক বিরোধ কীভাবে একটি নিষ্পাপ প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, এই প্রশ্নই এখন সীতাকুণ্ডের বাতাসে ভাসছে।

