একটি জাতি কতটা সমৃদ্ধ, তা পরিমাপ করা হয় সেই জাতির জ্ঞানতাপস ও সৃজনশীল মানুষদের সংখ্যা দিয়ে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘একুশে পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গভীর দর্শনেরই প্রতিফলন ঘটালেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রাষ্ট্র কাউকে সম্মানিত করে মূলত নিজের প্রয়োজনেই। কারণ, সমাজে যত বেশি কৃতি মানুষের জন্ম হবে, সমৃদ্ধি আর নৈতিকতার মানদণ্ডে সেই সমাজ তত বেশি আলোকিত হবে।
এদিন অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। কোনো রাজকীয় প্রটোকল বা বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের আড়ালে নয়, বরং সচিবালয় থেকে সাধারণ মানুষের মতো পায়ে হেঁটে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন এবং অনুষ্ঠান শেষে একইভাবে হেঁটে সচিবালয়ে ফিরে যান। পদক হস্তান্তর অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত নিপুণভাবে সঞ্চালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন এই পদকের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই মহৎ উপলব্ধি থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একুশে পদক প্রবর্তন করেছিলেন।” তার মতে, এটি কেবল একটি পদক নয়; বরং ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আজকের বাংলাদেশ পর্যন্ত সকল ঐতিহাসিক মাইলফলককে স্মরণে আনার একটি মাধ্যম। এই পদকের মধ্য দিয়ে গুণীজনদের কাজের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সেতুবন্ধন তৈরি হয়।
তারেক রহমান একুশে পদকের বিবর্তন তুলে ধরে জানান, ১৯৭৬ সালে মাত্র তিনটি ক্যাটাগরিতে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ সেটি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ অন্তত ১২টি শাখায় বিস্তৃত হয়েছে। এই প্রসারণকে তিনি রাষ্ট্রের একটি ইতিবাচক অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের চর্চাকে ‘রাজনীতিকরণ’ করার কুফল নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি কঠোরভাবে উল্লেখ করেন, “শিক্ষা বা গবেষণাকে রাজনীতির ছাঁচে ফেলা কখনোই সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।” বর্তমান সরকার এমন এক উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, যেখানে মেধা ও নৈতিকতা হবে মাপকাঠি। আর এই অভিযাত্রায় দেশের বিজ্ঞজনদের দিক-নির্দেশনা একান্ত কাম্য বলে তিনি জানান।
জাতীয় ইতিহাসে ফেব্রুয়ারি মাসের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্মপরিচয়ের স্মারক এবং সংস্কৃতিচেতনার প্রাণপ্রবাহ। এটি যেমন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াই ছিল, তেমনি ছিল শোষকের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। তাই ফেব্রুয়ারি মানেই শেকড় সন্ধানের মাস।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, গুণীজনদের কর্মময় জীবনের সঙ্গে আপামর জনসাধারণের পরিচয় করিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি। তিনি পদকপ্রাপ্তদের সবার দীর্ঘ ও কল্যাণময় জীবন প্রার্থনা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, তাদের দেখানো পথেই আগামীর বাংলাদেশ আরও বেশি সৃজনমুখর হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বক্তব্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভাষণ ছিল না, বরং এটি ছিল মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার রোডম্যাপ। যেখানে জ্ঞানীরা প্রাপ্য সম্মান পাবেন এবং রাষ্ট্র হবে তাঁদের সৃজনশীলতার প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

