ফেব্রুয়ারি মাসের ক্যালেন্ডার এখনো শেষ হয়নি, কিন্তু এর মধ্যেই বাংলাদেশ ভূখণ্ড কেঁপে উঠেছে আট-আটবার। বুধবার রাতে মিয়ানমারে সৃষ্ট ৫.১ মাত্রার মাঝারি এক ভূমিকম্পে যখন ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো দুলছিল, তখন সাধারণ মানুষের মনে ত্রাস আর আতঙ্ক মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। প্রশ্ন উঠছে একটিই—এই ঘন ঘন ছোট কম্পনগুলো কি বড় কোনো প্রলয়ঙ্কারী দুর্যোগের আগাম বার্তা?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বুধবার রাত ১০টা ৫১ মিনিটে অনুভূত হওয়া সর্বশেষ এই কম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১২৯ কিলোমিটার গভীরে। তাৎক্ষণিকভাবে জানমালের বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর না এলেও, মাঝরাতে হঠাৎ বিছানা-আসবাবপত্র নড়ে ওঠায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।
চলতি মাসে ভূমিকম্পের এই ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩ মাত্রার মৃদু কম্পন দিয়ে। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি এক দিনেই তিনবার কেঁপে ওঠে মাটি। সাতক্ষীরার কলারোয়া থেকে শুরু করে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল সেই কম্পনের রেশ। এরপর ৯, ১০ এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি দফায় দফায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে অনুভূত হয় ভূ-কম্পন। সব মিলিয়ে ২৬ দিনে আটবার কম্পন মোটেও স্বাভাবিক ঘটনা নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূমিকম্পের এই ঘনঘটা সাধারণ মানুষের মনে গত নভেম্বরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। সে সময় ৫.৭ মাত্রার এক কম্পনে দেশে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন শতাধিক। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই ফেব্রুয়ারির এই সিরিজ কম্পন নতুন করে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে কপালে।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার এই পরিস্থিতিকে দেখছেন গভীর উদ্বেগের চোখে। তার মতে, বাংলাদেশ ভারতীয় এবং ইউরেশীয়—এই দুটি দানবীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। ভূ-অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা হয়ে আছে, যা বের হওয়ার পথ খুঁজছে। ছোট ও মাঝারি এই কম্পনগুলো আসলে নির্দেশ করছে যে, ভেতরে বড় ধরনের কোনো অস্থিরতা চলছে। একে বড় দুর্যোগের ‘ওয়ার্নিং সাইন’ বা পূর্বলক্ষণ হিসেবেই দেখছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট কম্পনগুলো যদি জমে থাকা শক্তিকে ধাপে ধাপে বের করে দিত, তবে হয়তো বড় বিপদের ঝুঁকি কমত। কিন্তু আমাদের ভূতাত্ত্বিক গঠনে এই ছোট কম্পনগুলো অনেক সময় বড় ফাটলের পূর্বাভাস হিসেবে কাজ করে। ফলে যেকোনো সময় রিখটার স্কেলে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত ঝুঁকি সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনো মূলত উদ্ধার তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভূমিকম্প হওয়ার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ বের করার চেয়ে ভূমিকম্প সইতে পারে এমন ভবন নির্মাণে আমাদের অনীহা স্পষ্ট। বিল্ডিং কোড বা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মানার ক্ষেত্রে ব্যাপক গাফিলতি বড় শহরগুলোতে বিপর্যয়ের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা এবং সেগুলো সংস্কার বা অপসারণের কাজ এখনো কচ্ছপ গতিতে চলছে। অথচ বড় কোনো কম্পন আঘাত হানলে পুরান ঢাকা বা জনাকীর্ণ এলাকাগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো পর্যাপ্ত রাস্তাও নেই। নাগরিক সচেতনতার অভাবও এখানে এক বড় বাধা। ভূমিকম্পের সময় করণীয় কী, তা নিয়ে নিয়মিত মহড়া বা প্রচারণার অভাব দৃশ্যমান।
অধ্যাপক আখতারের মতে, “প্রকৃতি আমাদের সুযোগ দিচ্ছে সতর্ক হওয়ার। এখন সময় এসেছে ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপনা নির্মাণ নিশ্চিত করার এবং প্রতিটি নাগরিককে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রাথমিক জ্ঞান দেওয়ার।”
ভূ-গর্ভের এই রহস্যময় অস্থিরতা কবে থামবে তা কারো জানা নেই। তবে ২৬ দিনে আটবার কেঁপে ওঠার এই পরিসংখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। এই ছোট ছোট ধাক্কাগুলো কি আমাদের জাগিয়ে তুলতে পারবে, নাকি বড় কোনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ার পরই আমাদের হুশ ফিরবে—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

