বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের চেপে বসা ‘পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি’ বা বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার ধারা চিরতরে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজের প্রথম কর্মদিবসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই কড়া বার্তা দেন।
তিনি স্পষ্ট করে জানান, দেশের অর্থনীতিকে গুটিকতক মানুষের হাত থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে হবে। তার মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনাই হবে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার ও পেশাদারিত্বের সংকট
আর্থিক খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। সবার আগে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা নিশ্চিত করা ছাড়া আমরা যত বড় অর্থনৈতিক কর্মসূচিই হাতে নিই না কেন, তা কোনো সুফল বয়ে আনবে না।”
তিনি মনে করেন, বিগত বছরগুলোতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই স্থবিরতা কাটাতে দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
পৃষ্ঠপোষকতা বনাম অর্থনৈতিক গণতন্ত্র
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি বা ক্রনি ক্যাপিটালিজম আর চলতে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের অর্থনীতি হতে হবে প্রতিটি নাগরিকের জন্য। এখানে একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সবার জন্য সমান সুযোগ থাকতে হবে। প্রতিটি মানুষ যেন অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং অর্থনীতির সুফল যেন সবার ঘরে পৌঁছায়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, বিশেষ কোনো রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে বাজার ও অর্থনীতিকে জিম্মি করার দিন শেষ হয়ে আসছে।
ডিরেগুলেশন ও বাজার উদারীকরণ
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ‘ওভার রেগুলেটেড’ বা অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি করতে গিয়ে অর্থনীতিতে অসম নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন সময় এসেছে সিরিয়াসলি ডিরেগুলেটেড বা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার। আমরা লিবারলাইজেশন বা বাজার উদারীকরণের দিকে এগোব।”
মন্ত্রী জানান, সরকারি অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনলে ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে। সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতি ফেরানো সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন যাত্রা
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কেবল একজন ঝানু রাজনীতিবিদই নন, বরং তার রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য এর আগে ২০০১ সালে বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই জ্যেষ্ঠ সদস্যকে এবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে মূলত আর্থিক খাতের সংস্কারের বড় বার্তা দিতে চেয়েছে নতুন সরকার।
সচিবালয়ে প্রথম দিনেই তার বক্তব্যে যে সংস্কারমুখী মনোভাব ফুটে উঠেছে, তাতে বিনিয়োগকারী ও সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি আশারও সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা রোধে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।

