বাংলাদেশে নবগঠিত সরকারের প্রথম কর্মদিবসেই রাষ্ট্র সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কঠোর বার্তা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার সচিবালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করে জানান, গত দেড় বছরের অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে দেশে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির মতো বিচারহীনতার সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করা হবে।
সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সরকারের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ থাকলেও, মন্ত্রী একে দেখছেন রাষ্ট্র গড়ার এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। তিনি বলেন, দেশ গড়ার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই এখন মূল মনোযোগ দেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা ও মব জাস্টিস নিয়ন্ত্রণ
গত কয়েক বছরে দেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি স্বীকার করেন যে, একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ঘটেছিল। তবে এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির দিকে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, “একটি বড় ঝড় বা গণ-অভ্যুত্থানের পর সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা ঠিক নয়। তবে আমরা মব জাস্টিস কোনোভাবেই বরদাশত করব না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে যা যা প্রয়োজন, তার সবই করা হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এক বছরেরও বেশি সময় পার করার পর একটি সফল নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা পুনরায় শুরু হয়েছে। একে তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন।
তৃণমূল ও ডেমোক্রেসি: আগামীর পথ
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এই বিভাগটি সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। গণতন্ত্রকে তিনি শাসনের প্রধান ‘উপাদান’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের সমস্যা সমাধান এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করাই হবে তার প্রাথমিক কাজ।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে এই মন্ত্রণালয় পরিচালনায় বাড়তি সুবিধা দেবে। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এই মন্ত্রণালয়কে একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব।
অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
দেশের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি ভেঙে পড়েছে—এমন সমালোচনার জবাবে মন্ত্রী কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি দাবি করেন, পরিস্থিতি যতটা খারাপ বলা হচ্ছে, বাস্তবে ততটা নয়। বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে।
তিনি মনে করেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সাহায্য করবে।
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ
আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এই নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বড় সব মহলের অংশগ্রহণ থাকায় একে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হিসেবেই দেখছে সরকার।
তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভাগ্য বা তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। মন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনার পর সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন
বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রম নিয়ে কোনো ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা দেখছেন না নতুন এই মন্ত্রী। তার মতে, একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে তারা গণতন্ত্রে উত্তরণের যে পথ তৈরি করে দিয়ে গেছে, তার জন্য তারা কৃতিত্ব পাওয়ার দাবিদার।
মির্জা ফখরুল বলেন, “তারা তাদের কাজের সিংহভাগ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে। তাদের প্রধান কাজ ছিল গণতন্ত্রে উত্তরণ নিশ্চিত করা, যা তারা করে দিয়েছে।”
নতুন সরকারের এই শুরুর দিনে মন্ত্রীর কথায় আত্মবিশ্বাস এবং আগামীর জন্য একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় ফুটে উঠেছে। তবে মব জাস্টিস বন্ধ করা এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুরোপুরি চাঙ্গা করা সরকারের জন্য কতটা সহজ হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

