বাংলাদেশের উত্তাল রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল এবং অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। মাত্র তিন বছরের সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে তিনি দেশের তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও ভিন্ন আদর্শের সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভাকে শপথ পড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি এই নজিরবিহীন ইতিহাসের অংশ হলেন।
রাষ্ট্রপতির এই যাত্রার শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি। সেই সময় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে টানা চতুর্থবারের মতো শপথ পাঠ করান তিনি। তবে ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই সরকারের নাটকীয় পতন ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে দেশে এক বড় ধরনের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়।
সেই সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন দ্বিতীয়বারের মতো ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ৫ আগস্টের পর সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত এক ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ও তার উপদেষ্টা পরিষদকে শপথ পড়ান তিনি। এর মাধ্যমে দেশ এক নতুন সংস্কারের পথে হাঁটা শুরু করে।
আজকের (মঙ্গলবার) বিকেলটি ছিল রাষ্ট্রপতির সেই বর্ণাঢ্য এবং ঘটনাবহুল তালিকার তৃতীয় অধ্যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে দুই দশক পর আবারও ক্ষমতায় ফেরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ালেন তিনি। একই সাথে তিনি নতুন সরকারের ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীরও শপথ বাক্য পাঠ করান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত একজন রাষ্ট্রপতি তার পাঁচ বছরের মেয়াদে বড়জোর এক বা দুইবার সরকারকে শপথ পড়ানোর সুযোগ পান। কিন্তু ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬—পর পর তিন বছরে তিনটি পৃথক শাসনব্যবস্থাকে (দলীয় সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার ও আবারও নির্বাচিত দলীয় সরকার) শপথ পড়ানো বাংলাদেশের ইতিহাসে তো বটেই, বিশ্ব রাজনীতিতেও বেশ দুর্লভ একটি ঘটনা।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের এই তিন বছরের কার্যকাল ছিল যেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক সংক্ষিপ্তসার। তিনি একদিকে যেমন দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সরকারের শপথের সাক্ষী ছিলেন, তেমনি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ক্রান্তিকালীন সরকারেরও অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর আজ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের এই চূড়ান্ত ধাপটিও তার হাতেই সম্পন্ন হলো।
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উন্মুক্ত প্রান্তরে আজ যখন নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শপথ নিচ্ছিলেন, তখন অনেকের মনেই ভেসে উঠছিল গত দুই বছরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। রাষ্ট্রপতির জন্য এই মুহূর্তটি ছিল কেবল একটি দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের তিনটি ভিন্ন স্রোতকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার এক অনন্য জার্নি।

