বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জুলাই সনদ’ কেবল একটি দলিলে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি হতে যাচ্ছে স্বৈরতন্ত্রের কবর এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের বর্ম। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এই দাবি করেন। তিনি বলেন, জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত হলে এ দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাবে।
জাতির এই ক্রান্তিকালে জুলাই সনদ প্রণয়ন এবং গণভোটে দেশবাসীর বিপুল সমর্থন পাওয়াকে বর্তমান সরকারের সবচাইতে বড় অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক ছোট-বড় কথা মানুষ ভুলে যেতে পারে, কিন্তু জুলাই সনদের কথা ইতিহাস কোনোদিন ভুলবে না।” এই সনদ রচনায় অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে তিনি বিশেষ ধন্যবাদ জানান।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের আঁকা সেই ‘নতুন বাংলাদেশের’ রূপরেখাকে বাস্তবে রূপ দিতে গত ১৮ মাসে ব্যাপক আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা জানান, রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে তার সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী এনেছে এবং ৬০০টিরও বেশি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে। অত্যন্ত স্বস্তির বিষয় হলো, এসবের ৮৪ শতাংশই ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
দেশের ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, “আমরা যখন দায়িত্ব নেই, থানাগুলো ছিল পুলিশশূন্য। মানুষ ছিল আতঙ্কগ্রস্ত। আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র নিয়ে জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না, ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে মানুষ মারার সংস্কৃতিও আমরা বন্ধ করেছি।” তিনি জানান, পুলিশ বাহিনীকে একটি পেশাদার ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে এই সরকার এক ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেছে। বিচারকদের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন এবং দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা ‘মাজদার হোসেন মামলার’ রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়েছে। ড. ইউনূস গর্বের সঙ্গে বলেন, “গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আমরা বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছি।”
নারীর নিরাপত্তা ও অধিকারকে এই সংস্কার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেন, “নারীদের অগ্রযাত্রা ছাড়া নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা অসম্ভব।” কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ একাধিক আইন সংশোধন ও কঠোর করা হয়েছে।
বিগত ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের সেই ‘আয়নাঘর’ ও নিপীড়নের কালো দিনগুলোর কথা স্মরণ করে ড. ইউনূস বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনই কেবল পারে ভবিষ্যতে কোনো জালিমকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে বাধা দিতে। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধৈর্য ও সহযোগিতার জন্য সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানান।
ভাষণের শেষে ড. ইউনূস স্মরণ করিয়ে দেন, বিচার একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং কয়েকটি মামলার রায়ও ঘোষিত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনগুলোতেও অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে এই বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। ১৮ মাসের এই ঐতিহাসিক যাত্রা শেষে তিনি এক নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করে বিদায় নিলেন ক্ষমতার পাদপ্রদীপ থেকে।

