দায়িত্ব গ্রহণের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল এক বিপর্যস্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ভেঙে পড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা, লাগামহীন অর্থপাচার আর তলাবিহীন কোষাগারের সেই কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বুনিয়াদ রেখে যাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে তিনি গত ১৮ মাসের আর্থিক খতিয়ান তুলে ধরেন।
ড. ইউনূস অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ক্ষতগুলো স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী সরকার আমাদের জন্য একটি ফতুর হয়ে যাওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক রেখে গিয়েছিল। প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে, যার ফলে ঋণের এক বিশাল বোঝা আমাদের কাঁধে চেপে বসেছিল। শুরুতে আমরা কাজ করার কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।”
তবে ১৮ মাস পর ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, বর্তমান সরকার সেই সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এখন আর ‘চোখে অন্ধকার’ দেখার পরিস্থিতি নেই। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি জানান, পাওনাদারদের তাড়া খাওয়ার ভয় কাটিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্ববাজারে একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রধান সমস্যা দ্রব্যমূল্য নিয়েও কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণের ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাজার তদারকি এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে বলে তিনি মনে করেন।
শ্রমিক অধিকারকে মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করে ড. ইউনূস জানান, তার সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশনগুলো অনুসমর্থন করেছে। একইসাথে একটি যুগান্তকারী নতুন শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে। প্রবাসীদের সুরক্ষায় আইন সংশোধন এবং বিদেশে আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকেও তিনি সফলতার তালিকায় রেখেছেন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ড. ইউনূস একটি বড় পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “নতজানু পররাষ্ট্রনীতি কিংবা অন্যের নির্দেশনায় চলার দিন শেষ হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ নিজের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আত্মবিশ্বাসী। আমরা বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলেছি।”
ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। ড. ইউনূস আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘদিন এই ইস্যুটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মৃতপ্রায় হয়ে ছিল। তার সরকারের প্রচেষ্টায় এটি পুনরায় বিশ্ব মনোযোগের কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের বাংলাদেশ সফর এবং রোহিঙ্গা বিষয়ে বিশেষ সভা আয়োজনের মাধ্যমে এই সংকটের একটি টেকসই সমাধানের পথ প্রশস্ত হয়েছে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বন্দর ব্যবস্থাপনা ও ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে তার সরকার একাধিক কৌশলগত প্রকল্প ও নতুন কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে, যা ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও বেগবান করবে। ড. ইউনূসের মতে, এই সংস্কারগুলো কেবল বর্তমানের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি শোষণমুক্ত ও স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে প্রথম ধাপ।

