দেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ঋণের অঙ্ক এবার আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নবনির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের ঘোষিত মোট দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজেদের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে টিআইবি দেখিয়েছে, গত দেড় দশকে সংসদ সদস্যদের ঋণের বোঝা কীভাবে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। নবম জাতীয় সংসদে যেখানে এমপিদের মোট ঋণ ছিল মাত্র ১ হাজার ১০৭ কোটি টাকা, সেখানে দশম সংসদে তা বেড়ে হয় ৩ হাজার ৬২৪ কোটি। একাদশ ও দ্বাদশ সংসদে এই অঙ্ক যথাক্রমে ৬ হাজার ৪২৩ কোটি এবং ১০ হাজার ৩৯২ কোটিতে পৌঁছায়। এবার সেই ধারাবাহিকতায় ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করল।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের প্রায় অর্ধেক সদস্যই কোনো না কোনোভাবে ঋণগ্রস্ত। দলীয় হিসেবে দেখা গেছে, বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬২ দশমিক ০২ শতাংশই দায়বদ্ধ। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত সদস্যদের ক্ষেত্রে এই হার ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবে সামগ্রিকভাবে বিগত সংসদগুলোর তুলনায় এবার ঋণগ্রস্ত এমপির হার কিছুটা কমে ৪৯ দশমিক ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দ্বাদশ সংসদে ছিল ৫২ শতাংশ।
আর্থিক স্বচ্ছতার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে টিআইবি জানায়, নির্বাচিত সদস্যদের একটি বড় অংশই বেশ বিত্তবান। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ৬৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ এমপির বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে ৪৮ জন সদস্য রয়েছেন যারা বছরে কোটি টাকারও বেশি আয় করেন। এই চিত্রটি দেশের সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় জনপ্রতিনিধিদের বিশাল অর্থনৈতিক পার্থক্যের দিকেই ইঙ্গিত করে।
কেবল আর্থিক হিসাব নয়, নির্বাচনি মাঠের শুদ্ধাচার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। এর মধ্যে বড় অংশই ছিল প্রচারণায় মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য না থাকা, মিছিল-শোডাউন এবং মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় অতিরিক্ত সমর্থক নিয়ে আসার মতো ঘটনা। এমনকি প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পোস্টার বা ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার মতো অসহিষ্ণু আচরণও পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে।
টিআইবি তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি কিংবা স্বতন্ত্র—কোনো পক্ষই আচরণবিধি পুরোপুরি মেনে চলেনি। বিধিমালা লঙ্ঘনের ৫৮টি ভিন্ন ভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দল নির্বিশেষে প্রার্থীদের মধ্যে নিয়ম ভাঙার এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সংসদীয় গণতন্ত্রের সুফল পেতে হলে জনপ্রতিনিধিদের কেবল হলফনামায় তথ্য দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং এই বিপুল পরিমাণ ঋণের উৎস এবং এর পরিশোধ প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। একইসাথে নির্বাচনের মাঠে যে অরাজকতা বা বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

