দীর্ঘ দেড় দশক পর বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন জানায়, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। তবে নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিদের সংখ্যা আশাব্যঞ্জক না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছে মিশনটি।
ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস সংবাদ সম্মেলনে মিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এবারের নির্বাচন ছিল ২০০৮ সালের পর প্রথম সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের পথে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।” তিনি আরও যোগ করেন, নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত এই নির্বাচন বিশ্বজনীন মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং ভোটারদের মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়ে প্রশংসা করে ইভার্স ইজাবস বলেন, কমিশন এবার সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পেরেছে। অংশীজনদের আস্থা বজায় রাখা এবং নির্বাচনের অখণ্ডতা রক্ষায় কমিশনের সক্রিয় দৃষ্টিভঙ্গি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে গণমাধ্যমের প্রশ্নের দ্রুত জবাব দেওয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ চালিয়ে যাওয়া নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হিসেবে নির্বাচনে নারীদের নগণ্য অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়। ইভার্স ইজাবস বলেন, “আমরা লক্ষ্য করেছি যে এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা যেমন কম ছিল, তেমনি সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধির সংখ্যাও মোটেও ইতিবাচক নয়।” উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র সাতজন নারী সদস্য নির্বাচিত হতে পেরেছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে অত্যন্ত অপ্রতুল। ইইউ মিশন মনে করে, নারীদের জন্য সীমিত রাজনৈতিক সুযোগ তাদের সমান অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিনটি ছিল সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ। প্রতিটি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতি এবং কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। তবে ইভার্স ইজাবস সতর্ক করে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের বিক্ষিপ্ত রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য বা ‘ম্যানিপুলেটেড ন্যারেটিভ’ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুল তথ্যের কারণে সৃষ্ট আতঙ্ক দূর করতে আরও কার্যকর ব্যবস্থার সুপারিশ করেন তিনি।
মিশন প্রধান উল্লেখ করেন যে, ২০২৫ সালের আইনি সংশোধনীগুলো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে শক্তিশালী করেছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং আইনি ফাঁকফোকরগুলো পুরোপুরি বন্ধ করতে ভবিষ্যতে আরও সংস্কার প্রয়োজন। আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে মোট ২০০ জন পর্যবেক্ষক এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। এর মধ্যে ৯০ জন ছিলেন সংক্ষিপ্তকালীন পর্যবেক্ষক। দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশে ইইউ-এর পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ মিশনের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে এই নির্বাচনের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইভার্স ইজাবস জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দলের প্রধান টমাস জ্যাচোভস্কিও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন সংসদ ও সরকারকে জনগণের এই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজগুলো বেগবান করার আহ্বান জানান তিনি।

