বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। শনিবার সকালে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষ অত্যন্ত সচেতনভাবে এবং দ্বিধাহীন চিত্তে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর পক্ষে তাদের রায় দিয়েছেন। এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আর পুরোনো শাসনব্যবস্থায় ফিরে যেতে আগ্রহী নয়।
অধ্যাপক রীয়াজ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের মাধ্যমে জনগণ স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পরিবর্তে রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের পথ বেছে নিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গণভোটে প্রায় ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার অংশ নিয়েছেন, যা মোট ভোটারের ৬০.৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ কোটি ৮২ লাখের বেশি মানুষ অর্থাৎ কাস্ট হওয়া ভোটের ৬৮ শতাংশই ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় দিয়েছেন।
পরিসংখ্যানের গভীরতা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, এবারের গণভোটে অংশগ্রহণের হার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়েও এক শতাংশ বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, ভোটাররা কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে কতটা আগ্রহী। তিনি আরও জানান, প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ ‘না’ ভোট দিলেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোট সংস্কারের পক্ষে এক অজেয় জাতীয় ম্যান্ডেট তৈরি করেছে।
বিফ্রিংয়ে অধ্যাপক রীয়াজ প্রধান উপদেষ্টার পূর্ববর্তী একটি বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, একটি প্রকৃত জাতীয় রূপান্তর কখনোই একক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত বা শাসনে সম্ভব নয়। পরিবর্তনের চূড়ান্ত বৈধতা আসে কেবল জনগণের সম্মতির মাধ্যমে। আর সেই গণতান্ত্রিক পথেই সরকার এই গণভোটের আয়োজন করেছিল। আজ জনগণ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে পরিবর্তনের দিশা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, “এই জয়কে কেবল গাণিতিক সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। এই রায় মূলত ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি। যারা রাজপথে লড়াই করেছিলেন, তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যেই এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো প্রণয়ন করা হয়েছিল।” আজ সেই প্রস্তাবগুলো জনমতের কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও জানান, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এখন দ্বিমুখী দায়িত্ব পালন করতে হবে। জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী, তারা একদিকে যেমন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন, অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। জনগণের এই রায় বাস্তবায়ন করা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি পবিত্র আমানত ও নৈতিক দায়িত্ব।
বিফ্রিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার এবং প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তারা উভয়েই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এই গণভোটের গুরুত্ব এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রশংসা করেন। অধ্যাপক রীয়াজ আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন সরকার জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দ্রুত সংস্কারের কাজগুলো সম্পন্ন করবে।
পরিশেষে, অধ্যাপক আলী রীয়াজ সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার এখন আর কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট গণদাবি। যারা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাদের প্রধান কাজই হবে জুলাই সনদের চেতনাকে সংবিধানে স্থায়ী রূপ দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরুত্থান না ঘটে।

