টানা কয়েকদিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সড়কে আবারও ফিরেছে যান্ত্রিক ব্যস্ততা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোটের জন্য আরোপ করা দীর্ঘ ৭২ ঘণ্টার কড়া নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে শনিবার ভোর রাত থেকেই সড়কে অবাধে চলাচল শুরু করেছে মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহন। একই সাথে খুলতে শুরু করেছে বিপণিবিতানগুলোও, যা নগর জীবনে স্বস্তির ছোঁয়া নিয়ে এসেছে।
শনিবার সকালে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। রামপুরা, হাতিরঝিল, কারওয়ান বাজার থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত প্রতিটি মোড়ে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, সিএনজি ও বাসের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। যদিও নির্বাচনের দীর্ঘ ছুটির কারণে রাজপথে যানবাহনের চাপ সাধারণ দিনের তুলনায় কিছুটা কম, তবে চালক ও যাত্রীদের চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের স্বস্তি।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, গত ১০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেলের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল। এই ৭২ ঘণ্টা বাইক চালকদের জন্য যেমন ছিল চ্যালেঞ্জিং, তেমনি নির্বাচনের নিরাপত্তার জন্য ছিল অপরিহার্য। শনিবার ভোর থেকেই সেই বাধা দূর হওয়ায় কর্মস্থলে ফেরা মানুষেরা যেন হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন।
খিলগাঁও থেকে নিজের মোটরবাইকে করে গুলশানে অফিসে যাচ্ছিলেন রিয়ান আরাফাত। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, “নির্বাচনের এই তিনটা দিন কোথাও মুভ করতে পারিনি, খুব অস্বস্তিতে ছিলাম। বাইক ছাড়া চলাচল করা আমাদের জন্য সত্যিই কঠিন। তবে দেশের জন্য একটা সুন্দর ভোট হয়েছে, এটাই বড় পাওয়া। আজ থেকে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছি।”
রাজধানীর চিরচেনা যানজট আজ কিছুটা কম থাকার কারণ হিসেবে চালকরা বলছেন, অনেকেই ভোটের ছুটিতে ঢাকা ছেড়েছেন এবং তারা এখনো পুরোপুরি ফেরেননি। তবে রবিবার থেকে পুরোদমে অফিস-আদালত শুরু হওয়ায় সন্ধ্যার পর থেকেই ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে যানবাহনের জটলা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাক ও পিক-আপ চালক মামুনুর রশিদ জানান, তিনি গত রাতেই ঢাকা ফিরেছেন এবং আজ সকাল থেকে কোনো বাধা ছাড়াই গাড়ি চালাতে পারছেন।
যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে শপিংমলগুলোতেও। রাজধানীর জনপ্রিয় বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল দশটা থেকেই ক্রেতাদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে মলের প্রবেশদ্বার। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভিড়ও বাড়তে শুরু করেছে। গাড়ি পার্কিং এরিয়াতে ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি নির্দেশ করছে যে, মানুষ আবারও কেনাকাটা ও সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেক্সিক্যাব, পিক-আপ ও মাইক্রোবাসের ওপরও ২৪ ঘণ্টার কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই স্থবিরতা কাটিয়ে সারাদেশের পণ্যবাহী ট্রাক ও লরি চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্বাচন উত্তর এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও এখন বেশ কিছুটা শিথিল অবস্থানে দেখা গেছে। তবে মোড়ে মোড়ে টহল পুলিশের উপস্থিতি ছিল সতর্ক। সাধারণ মানুষের মতে, বড় ধরণের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন হওয়া এবং দ্রুত স্বাভাবিক জনজীবন ফিরে আসা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক।
এখন অপেক্ষা কেবল রবিবারের, যখন রাজধানী আবারও তার পূর্ণ কর্মব্যস্ত রূপ ফিরে পাবে। অফিসগামী মানুষের পদচারণা আর যানবাহনের চিরচেনা শব্দে পুরোপুরি মুছে যাবে নির্বাচনের কয়েকদিনের সেই থমথমে নীরবতা।

