বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমান্তরালে দেশজুড়ে পরিচালিত হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ওপর ঐতিহাসিক গণভোট। প্রাথমিক ও বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, দেশের ভোটাররা সংবিধানের আমূল সংস্কারের পক্ষে তাদের রায় দিচ্ছেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
রাজধানীর বিভিন্ন সংসদীয় আসনের ১০৬টি কেন্দ্রের প্রাথমিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জনমতের বিশাল একটি অংশ প্রস্তাবিত সংস্কারের পক্ষে। এই কেন্দ্রগুলোতে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে মোট ৬৯ হাজার ৩৪৭টি, যার বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৯৪৫টি। বিপুল এই ব্যবধান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ গত দেড় দশকের ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রূপ বদলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রকাঠামো চায়।
‘জুলাই জাতীয় সনদ’ কার্যকর হলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই সনদে মূলত রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। গণভোটে চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রপতি কেবল নামমাত্র প্রধান থাকবেন না; বরং তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে পারবেন।
সনদটির অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো ‘দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ’ ব্যবস্থা। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যের একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠন করা হবে। এটি আইন প্রণয়নে অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর বা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না—এমন বিধানও এই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিচার বিভাগীয় সংস্কারের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সরাসরি আপিল বিভাগ থেকে বাধ্যতামূলক করা এবং হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের বাজেট ও অনাস্থা ভোট ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মানবাধিকার রক্ষায় এই সনদটি অত্যন্ত শক্তিশালী। জরুরি অবস্থায়ও যেন নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব না হয়, সেই গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে এতে। এছাড়া রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের একচেটিয়া অধিকারে রাশ টেনে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগী পরিবারের সম্মতি ছাড়া দণ্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা করা যাবে না। নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকেও এবার সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার পথে হাঁটছে দেশ।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সকাল থেকেই সংসদ নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি গণভোটের ব্যালটেও ভোটারদের ব্যাপক আগ্রহ ছিল। নতুন প্রজন্মের ভোটাররা মনে করছেন, এই গণভোটের মাধ্যমেই ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা সংবিধানে স্থায়ী রূপ পাবে। যদিও কিছু রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে, তবে মাঠপর্যায়ের ভোটাররা সামগ্রিক সংস্কারকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
বর্তমানে জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে ফলাফল আসতে শুরু করেছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চূড়ান্ত ফলাফলে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এটি কার্যকর হলে বাংলাদেশ কেবল একটি নতুন সরকারই পাবে না, বরং একটি নতুন শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে। রাত বাড়ার সাথে সাথে সারাদেশের পূর্ণাঙ্গ চিত্রটি স্পষ্ট হবে।

