দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে যে দিনটির অপেক্ষায় ছিল কোটি মানুষ, সেই বহু প্রতীক্ষিত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ অবশেষে এসেছে। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর গুলশান মডেল হাইস্কুল কেন্দ্রে নিজের ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, আর চোখে ছিল একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন।
সকাল ৯টা ৩৬ মিনিটে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন তিনি। সাথে ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমান। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দীর্ঘ সময় পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শরিক হতে পেরে তার মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। ভোটদান শেষে ঠিক ৯টা ৫০ মিনিটে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে তিনি কথা বলেন দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে।
তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানান, যদি তার দল জনগণের রায়ে সরকার গঠন করার সুযোগ পায়, তবে তাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে দেশের ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল সংস্কার। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নাগরিকের নিরাপত্তা। যখন সাধারণ মানুষ পথে চলতে বা ঘরে ঘুমানোর সময় নিজেকে নিরাপদ বোধ করবেন, তখনই প্রকৃত গণতন্ত্র সার্থক হবে।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে ছিল। তারেক রহমানের মতে, আজকের এই দিনটি কেবল একটি নির্বাচনি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনালগ্ন। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে।
নির্বাচনের আগের রাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও সংঘাতময় ঘটনার খবর পাওয়া গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তারেক রহমান কিছুটা গম্ভীর হয়ে ওঠেন। তবে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাহিনীর এই সক্রিয় ভূমিকাকে তিনি ‘আশাব্যঞ্জক’ বলে অভিহিত করেন।
তিনি ভোটারদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সারাদিন ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করতে হবে। তার মতে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই পারে যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা কারচুপির চেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিতে। “মানুষ যদি তাদের অধিকার রক্ষায় সচেতন থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ কোনো অপশক্তিই জয় ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না,”—দৃঢ়কণ্ঠে বলেন তিনি।
নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান মুচকি হেসে বলেন, তিনি শতভাগ আশাবাদী। জনগণের চোখের ভাষা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তাকে এই আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। তার মতে, বিএনপি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়ছে না, বরং মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াইয়ে নেমেছে।
সরকার গঠন করলে অগ্রাধিকার তালিকা কেমন হবে, সে বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন। তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই হবে তাদের ‘নাম্বার ওয়ান’ প্রায়োরিটি। সাধারণ মানুষের জীবন ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্যান্য উন্নয়ন সহজতর হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
নারীর ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রীয় কাজে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়ে তারেক রহমান আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা যেখানে নারী, সেখানে তাদের ঘরে বসিয়ে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতার প্রথম দিন থেকেই নারীর মূল্যায়ন ও তাদের ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
নির্বাচনি প্রচারণার শুরু থেকেই বিএনপি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা বলে আসছে। ভোট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও তারেক রহমান সেই সুরেই কথা বলেন। তিনি বলেন, বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়াই তার মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে একটি বসবাসযোগ্য দেশ উপহার দেওয়াই হবে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ।
ভোটকেন্দ্রের বাইরে তখন হাজার হাজার মানুষের ভিড়। সবার দৃষ্টি ছিল তাদের নেতার দিকে। দীর্ঘ নির্বাসন আর রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন এবং সরাসরি ভোটে অংশ নেওয়া দলটির কর্মীদের মাঝে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। জুবাইদা রহমান এবং জাইমা রহমানের উপস্থিতি সাধারণ নারী ভোটারদের মধ্যেও এক ধরনের ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
পরিশেষে, একটি শান্তিপূর্ণ আগামীর প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন। তারেক রহমানের এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি ছিল একজন রাজনৈতিক নেতার দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর জনগণের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত। এখন দেখার বিষয়, ব্যালট বক্সের ফলাফল তার এই আত্মবিশ্বাসের কতটা প্রতিফলন ঘটায়।
সারাদেশে ভোটগ্রহণ চলছে এবং সন্ধ্যার পর থেকেই আসতে শুরু করবে প্রাথমিক ফলাফল। তবে গুলশানের এই কেন্দ্রে তারেক রহমানের উপস্থিতি এবং তার বার্তাটি যে রাজনৈতিক মহলে গভীর প্রভাব ফেলবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণ ভোটাররা এখন তাকিয়ে আছেন একটি শান্তিপূর্ণ পরিণতির দিকে, যেখানে তাদের রায়ের প্রতিফলন ঘটবে স্বচ্ছভাবে।

