ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানকে নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে চলা কূটনৈতিক জল্পনায় নতুন মোড় নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল তাকে ডেনমার্কে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। তবে সবশেষ খবর অনুযায়ী, সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সরকার তাকে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশ ইরানে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তেহরানে তার নিয়োগের জন্য ইতিমধ্যে ‘এগ্রিমো’ বা নিয়োগ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
ঢাকার একটি দায়িত্বশীল সূত্র দাবি করেছে, ইরান সরকার ইতিমধ্যে অধ্যাপক নিয়াজ আহমদের নিয়োগ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে এবং তাকে নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে গ্রহণে সম্মতি জানিয়ে সবুজ সংকেত পাঠিয়েছে। যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। তবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিয়োগ প্রস্তাব বা এগ্রিমো এতদিনে চলে আসার কথা।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, অধ্যাপক নিয়াজ আহমদের এই কূটনৈতিক পদযাত্রার শুরু হয়েছিল ডেনমার্কের হাত ধরে। গত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তাকে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করে কোপেনহেগেনে এগ্রিমো পাঠানো হয়েছিল। তখন শোনা যাচ্ছিল, সব ঠিক থাকলে তিনি তিন মাসের মধ্যেই দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে সেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। কোপেনহেগেনের বদলে সরকারের নজর পড়ে শূন্য থাকা তেহরান মিশনের ওপর।
ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা অধ্যাপক নিয়াজ আহমদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দেশটিতে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কিছুটা নড়বড়ে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, অস্থিতিশীল তেহরানে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে খোদ উপাচার্যও খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না এবং তিনি তার এই মনোভাব সরকারের নীতিনির্ধারকদের জানিয়েছেন।
এদিকে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান উপাচার্য পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর তিনি তার মূল শিক্ষকতার পেশায় ফিরে যেতে চান। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে সরকার চাইলে তিনি আরও কিছুদিন দায়িত্ব পালন করতেও রাজি আছেন।
বর্তমানে তেহরানে বাংলাদেশের দূতাবাসে কোনো পূর্ণকালীন রাষ্ট্রদূত নেই; চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে বাণিজ্যিক কাউন্সিলর রাবেয়া সুলতানা অফিশিয়াল কাজ পরিচালনা করছেন। যদি আগামী সপ্তাহে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অধ্যাপক নিয়াজ আহমদের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়, তবে তিনিই হবেন তেহরানে বাংলাদেশের পরবর্তী স্থায়ী প্রতিনিধি। তবে সবটাই এখন নির্ভর করছে নির্বাচনের পর গঠিতব্য নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।
পরিশেষে, একজন প্রথিতযশা একাডেমিক ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রদূতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার এই প্রচেষ্টা যেমন প্রশংসিত হচ্ছে, তেমনি তাকে তেহরানের মতো স্পর্শকাতর মিশনে পাঠানো নিয়ে কূটনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন নাকি তেহরানের লাল গালিচায় হাঁটবেন—সে উত্তর মিলবে আগামী সপ্তাহেই।

