ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান তাঁর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সিদ্ধান্ত জানান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে তাঁর এই আকস্মিক ঘোষণা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উপাচার্য জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী এক বিশেষ ‘আপৎকালীন’ পরিস্থিতিতে তিনি এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তিনি মনে করছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমি একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ছাত্রদের অনুরোধে ও ভালোবাসায় এই আমানত গ্রহণ করেছিলাম। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, তাই আমি আমার মূল পেশা শিক্ষকতায় ফিরে যেতে চাই।”
রাজনৈতিক সরকারের জন্য পথ প্রশস্ত করার উদ্যোগ
ড. নিয়াজ আহমদ খান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, দেশে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন সরকার যেন তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাজিয়ে নিতে পারে, সেই সুযোগ করে দিতেই তিনি আগেভাগে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনের পর হঠাৎ পদত্যাগ করলে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারতো, তাই তিনি বর্তমান সময়কেই উপযুক্ত মনে করছেন।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হোক, সেটি তিনি চান না। উপাচার্য স্পষ্ট করেন যে, সরকার বা অংশীজনরা যদি ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে তাঁকে আরও কিছুদিন দায়িত্ব পালনের অনুরোধ জানান, তবে তিনি তা বিবেচনা করবেন। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে একটি নিরবচ্ছিন্ন ক্ষমতা হস্তান্তর বা ‘স্মুথ ট্রানজিশন’ প্রয়োজন। আমি চাই না আমার প্রস্থানের ফলে কোনো অচলাবস্থা তৈরি হোক।”
সাফল্য ও আগামীর পরিকল্পনা
গত প্রায় দেড় বছরের দায়িত্বকাল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন ৩০তম এই উপাচার্য। তাঁর সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম সচল হওয়া, হল সংসদগুলো কার্যকর হওয়া এবং আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির কথা তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে রয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সংকট অনেকাংশেই দূর করবে।
ব্যক্তিগত জীবনের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি ডেপুটেশনে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। এই ডেপুটেশন থেকে অব্যাহতি চেয়ে তিনি খুব শীঘ্রই আচার্য ও রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করবেন। এরপর তিনি তাঁর আদি বিভাগ—উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে গ্রেড-১ অধ্যাপক হিসেবে ফিরে গিয়ে নিয়মিত শিক্ষকতা ও গবেষণায় মনোনিবেশ করতে চান।
চাপের অভিযোগ অস্বীকার
কোনো বিশেষ মহলের চাপে পড়ে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, “আমি খুব সাধারণ মানুষ হলেও চাপে নতি স্বীকার করার মতো লোক নই। আমি স্বেচ্ছায় এবং অত্যন্ত সচেতনভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তিনি ছাত্রদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, অরাজনৈতিক ব্যক্তি হয়েও এই মহান প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাওয়া তাঁর জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। উপাচার্য হিসেবে তাঁর অধ্যায় শেষ হতে চললেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসেবে তিনি সবসময়ই প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

