আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে পুলিশ। মঙ্গলবার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের মাঠে যেকোনো ধরনের অস্ত্রই বড় ধরনের হুমকি বা ‘থ্রেট’ হিসেবে গণ্য হবে। কেবল অবৈধ বা লুট হওয়া অস্ত্রই নয়, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বৈধ অস্ত্রও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে পুলিশ এবার প্রযুক্তি ও জনবলের এক বিশাল সমন্বয় ঘটাচ্ছে। আইজিপি জানান, এবারের নির্বাচনে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য সরাসরি মাঠে মোতায়েন থাকবেন। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের কেন্দ্রে আসা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে পুলিশ প্রশাসন একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরির কাজ করছে।
অস্ত্র উদ্ধার ও জমা দেওয়ার হালনাগাদ তথ্য
থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এবং বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া নির্দেশনার পর এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার ৯৯৫টি বৈধ অস্ত্র মালিকরা পুলিশের কাছে জমা দিয়েছেন। কিছু অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি, তবে সেই সংখ্যা খুব বেশি নয় বলে তিনি দাবি করেন।
অনেকে ব্যক্তিগত কাজে বা লকারে তালা মেরে দেশের বাইরে অবস্থান করায় কিছু বৈধ অস্ত্র জমা দিতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে পুলিশ এই বিষয়টিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আইজিপি বলেন, “যেকোনো অস্ত্রই থ্রেট। দেশের বাইরে থেকে অবৈধ পথে অস্ত্র আসা ঠেকাতে সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ চেকপোস্টগুলোতে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।” নির্বাচনের সময় বৈধ অস্ত্রের প্রদর্শন বা ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে যাতে সাধারণ ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
প্রযুক্তিগত নজরদারি: সিসিটিভি ও ড্রোন
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হচ্ছে উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার। প্রথাগত পাহারার পাশাপাশি ডিজিটাল তদারকির ওপর জোর দিচ্ছে পুলিশ। আইজিপি বাহারুল আলম জানান, সারা দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে কন্ট্রোল রুম থেকে মুহূর্তের মধ্যেই কেন্দ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের পোশাকে থাকবে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ বা বডি ক্যামেরা। এর ফলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার স্বচ্ছ প্রমাণ সংগ্রহ করা সহজ হবে। এছাড়া দুর্গম বা স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নজরদারির জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারদের (এসপি) ড্রোনের মাধ্যমে তদারকি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আকাশ থেকে এই নজরদারি নির্বাচনকালীন বিশৃঙ্খলা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
নির্বাচনী এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে তিন ধরনের নিরাপত্তা কৌশলের কথা জানান আইজিপি। প্রথমত, ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা; দ্বিতীয়ত, এলাকাভিত্তিক মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের টহল; এবং তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা নজরদারি। পুলিশ প্রধান আশ্বস্ত করেছেন যে, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে যদি কেউ অস্ত্র প্রদর্শন বা ভোটারদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের এই বিশাল প্রস্তুতি মূলত ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা। আইজিপি বলেন, “শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা আমাদের পেশাদারিত্বের বড় পরীক্ষা। আমরা সেই পরীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।” অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তির এই কঠোর প্রয়োগ একটি বির্তকমুক্ত নির্বাচন উপহার দিতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

