বিশ্বজুড়ে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) তাদের বার্ষিক ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক-২০২৫’ (সিপিআই) প্রকাশ করেছে। ১৮২টি দেশের মধ্যে এবারের তালিকায় সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৩তম। গত বছর এই অবস্থান ছিল ১৪তম, অর্থাৎ তালিকায় বাংলাদেশের এক ধাপ উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে ধানমন্ডিস্থ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, ১০০ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশ এবার ২৪ অর্জন করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং দক্ষিণ আমেরিকার প্যারাগুয়েও বাংলাদেশের সমান স্কোর নিয়ে একই অবস্থানে রয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান ও সূচকে পরিবর্তনের পূর্বাভাস
এবারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্কোরে ১ পয়েন্টের সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। টিআইবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে যে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তার একটি ইতিবাচক ছায়া এই সূচকে পড়েছে। তবে এই উন্নতিকে এখনই স্থায়ী বা বড় কোনো পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না সংস্থাটি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই সূচকের তথ্য সংগ্রহের যে সময়সীমা ছিল, তাতে রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ার পরবর্তী বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। অর্থাৎ, আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যে সংস্কারের ডাক দেওয়া হয়েছিল, তার সুফল পেতে আরও সময়ের প্রয়োজন। সংস্কার প্রক্রিয়া যদি দৃশ্যমানভাবে গতি না পায়, তবে আগামীতে বড় কোনো উল্লম্ফন আশা করা কঠিন।
বিশ্বের দুর্নীতি চিত্র: ডেনমার্ক শীর্ষে, তলানিতে দক্ষিণ সুদান
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির এই মানচিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। এবারের সূচকেও দেখা গেছে, বিশ্বের কোনো দেশই ১০০-তে ১০০ স্কোর করতে পারেনি। সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ডেনমার্ক ৮৯ স্কোর নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, মাত্র ৯ স্কোর নিয়ে তালিকার সবশেষ বা সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এমন সব দেশে বসবাস করছে যেখানে দুর্নীতির মাত্রা ভয়াবহ। এমনকি যে দেশগুলো নিজেদের শক্তিশালী গণতন্ত্রের ধারক বলে দাবি করে, সেখানেও ইদানীং দুর্নীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, দুর্নীতি কেবল উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক সংকট।
সূচকের অংক ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
১৮২টি দেশের এই তালিকায় নিচ থেকে গণনা করলে বাংলাদেশ ১৩তম অবস্থানে থাকলেও, ভালো থেকে খারাপের উচ্চক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম। গত ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ যেখানে ১৪তম অবস্থানে ছিল, সেখান থেকে এবার এক ধাপ পিছিয়ে (উন্নত হয়ে) ১৩তম হওয়াটা ইতিবাচক হলেও সার্বিক স্কোর এখনও আশাব্যঞ্জক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতির স্কোর ২৪ থাকা মানে হলো দেশে দুর্নীতির গভীরতা এখনো অত্যন্ত প্রকট। টিআইবি মনে করে, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের স্বচ্ছতা না আনলে এই সূচকে বাংলাদেশের প্রকৃত উত্তরণ সম্ভব নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
সামনের পথ: সংস্কার বনাম বাস্তবতা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দুর্নীতির শেকড় বেশ গভীরে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার কারণে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি এখন বাতাসে ভাসছে, তা যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়, তবে পরবর্তী বছরের সূচকে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন এবং কাঠামোগত সংস্কারই বাংলাদেশকে তালিকার নিচের সারির লজ্জাজনক অবস্থান থেকে মুক্তি দিতে পারে।

