বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, অতীতের ধারাবাহিকতায় এ বছরও সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যয়ে কাউকে হজে পাঠানো হবে না। মঙ্গলবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি হজ ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন, ব্যয় সংকোচন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। উপদেষ্টার এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে হজের ক্রমবর্ধমান খরচ নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ছিল।
ধর্ম উপদেষ্টা তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, গত বছর থেকেই সরকারি খরচে হজের সংস্কৃতি বন্ধ করা হয়েছে এবং চলতি ২০২৬ সালেও এর ব্যতিক্রম হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনগণের করের টাকা এভাবে ব্যয় না করে বরং হজযাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং খরচ কমানোর দিকেই বর্তমান প্রশাসন বেশি মনোযোগী। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি হজ ব্যবস্থাপনায় একটি পেশাদার ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিমান ভাড়ায় বড় ছাড় ও হজযাত্রীদের অর্থ ফেরত
সংবাদ সম্মেলনে এক বিশেষ চমক হিসেবে উপদেষ্টা জানান, বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রে গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষির ফলে ২০২৫ সালে বিমান ভাড়া প্রায় ২৭ হাজার টাকা কমানো সম্ভব হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের হজের ক্ষেত্রেও গত বছরের তুলনায় বিমান ভাড়া আরও প্রায় ১৩ হাজার টাকা কমানো হয়েছে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২৪ সালে যেখানে একজন হজযাত্রীকে বিমান ভাড়া বাবদ ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮০০ টাকা গুনতে হতো, সেখানে ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকায়। এই দুই বছরে ধাপে ধাপে প্রায় ৪০ হাজার টাকা ভাড়া কমানোকে হজ ব্যবস্থাপনার একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ড. খালিদ হোসেনের মতে, এই ভাড়া আরও কমানোর চেষ্টা অব্যাহত ছিল এবং সামনের দিনগুলোতেও সরকার সাধারণ হজযাত্রীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে যাবে।
কেবল খরচ কমানোই নয়, অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রেও মন্ত্রণালয় এবার নজির সৃষ্টি করেছে। উপদেষ্টা জানান, গত বছর সরকারি মাধ্যমের হজযাত্রীদের হজ শেষে উদ্বৃত্ত হওয়া ৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা ইতোমধ্যে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন হজ এজেন্সির প্রায় ৩৮ কোটি টাকা সৌদি আরবে আটকে ছিল, যা মন্ত্রণালয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর শেষেও প্যাকেজ-১ ও প্যাকেজ-২ এর হজযাত্রীরা সব মিলিয়ে তিন কোটি টাকার বেশি ফেরত পাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সাশ্রয়ী হজ প্যাকেজ ও উন্নত আবাসন সুবিধা
সীমিত আয়ের ধর্মপ্রাণ মানুষদের কথা মাথায় রেখে এ বছর তিনটি ভিন্ন হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে সবচেয়ে সাশ্রয়ী প্যাকেজটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা। উপদেষ্টা জানান, হজ প্যাকেজ-৩ এর সার্ভিস চার্জ কমানোর জন্য সৌদি সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানির সাথে সফল আলোচনার মাধ্যমে হজযাত্রী প্রতি প্রায় ৬০০ সৌদি রিয়াল সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে।
আবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে মানবিক পরিবর্তন। আগে প্যাকেজ-৩ এর হজযাত্রীদের হারাম শরীফ থেকে ৬-৮ কিলোমিটার দূরে আজিজিয়া এলাকায় থাকার কথা ছিল, যা বয়স্ক হাজিদের জন্য যাতায়াতে বেশ কষ্টসাধ্য। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার এবার মক্কার হারাম শরীফের মাত্র দেড় কিলোমিটারের মধ্যে হজযাত্রীদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। এর ফলে হাজিরা কোনো পরিবহন বিড়ম্বনা ছাড়াই পায়ে হেঁটে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কাবা প্রাঙ্গণে আদায় করতে পারবেন।
প্রযুক্তি ও চিকিৎসায় নতুন মাত্রা
হজযাত্রীদের সেবাকে আরও আধুনিক ও সহজলভ্য করতে ‘লাব্বাইক’ নামক একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মোবাইল রোমিং সুবিধা এবং হজ প্রি-পেইড কার্ডের মতো নতুন সেবাগুলো হাজিদের সৌদি আরবে অবস্থানকালীন নানা ঝামেলা থেকে মুক্তি দেবে।
চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও এসেছে বড় সুখবর। ইতিপূর্বে সৌদি আরবের মেডিকেল সার্ভিস কোম্পানির সাথে একটি চুক্তির অধীনে হজযাত্রীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হতো। তবে এবার মন্ত্রণালয়ের নেগোসিয়েশনের ফলে বাংলাদেশের সব হজযাত্রী এই চিকিৎসা সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাবেন। ড. খালিদ হোসেন বলেন, সরকারি প্রতিনিধি দলে অনাবশ্যক ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে হজের প্রশাসনিক খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও নিয়োগ
ধর্ম উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে গত দেড় বছরের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, সততা ও জবাবদিহিতাকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দীর্ঘদিনের জনবল সংকট কাটাতে ১৬৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। আইনি জটিলতায় আটকে থাকা বাকি নিয়োগগুলোও দ্রুত শেষ করার আশ্বাস দেন তিনি।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের হজের সামগ্রিক প্রস্তুতিকে ‘সন্তোষজনক’ হিসেবে অভিহিত করে ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে পরিবহন চুক্তি—সবই স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় মাধ্যমে হজযাত্রীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই এখন মন্ত্রণালয়ের প্রধান লক্ষ্য।

