বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এক নতুন অধ্যায় সূচনার অপেক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে সংস্থাটি। ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই নির্বাচন কেবল অংশগ্রহণমূলকই হবে না, বরং তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতাও পাবে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মিশনের পর্যবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন ইভার্স ইজাবস। সেখানে তিনি বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য ভোটের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
গণতন্ত্রের নতুন দিগন্তের হাতছানি
সংবাদ সম্মেলনে ইভার্স ইজাবস বলেন, “আমরা মনে করি বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ একটি সুষ্ঠু ভোটের জন্য অনুকূল। এই নির্বাচন দেশটির গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইইউর পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে গণতন্ত্র, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং আইনের শাসনের মতো মৌলিক স্তম্ভগুলোর ওপর ভিত্তি করে।
ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষকের মতে, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নয়, বরং এতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিও জরুরি। ইইউ মিশন এমন একটি পরিবেশ দেখতে চায় যেখানে ভোটাররা বিনা বাধায় তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
নিরাপত্তা নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও মাঠের চিত্র
নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইভার্স ইজাবস জানান, মিশনের সদস্যরা ইতিমধ্যেই দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, সেনাবাহিনী এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, দেশের কিছু এলাকা ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক কারণে কিছুটা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তাদের ধারণা।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং এখন পর্যন্ত মাঠের পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক।” তবে ভোটের দিন এবং তার পরবর্তী সময়ে এই স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন এই পর্যবেক্ষক প্রধান।
নারী ও সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান
নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে অংশগ্রহণমূলক করার ক্ষেত্রে নারী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে ইইউ মিশন। ইভার্স ইজাবস বলেন, “যেকোনো সফল গণতন্ত্রের মাপকাঠি হলো সেখানে সংখ্যালঘু এবং নারীরা কতটা সুরক্ষিতভাবে তাদের মতামত দিতে পারছে। আমরা আশা করি, এবারের নির্বাচনে প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।”
তিনি উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনী পরিবেশের ওপর নারীদের আস্থার প্রতিফলনই বলে দেবে এই ভোট কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টিও মিশনের বিশেষ নজরদারিতে থাকছে।
সারা দেশে ৯টি দল ও ২০০ পর্যবেক্ষক
নির্বাচনের দিন দেশের আনাচে-কানাচে ইইউর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বড় ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। আজই সারা দেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলায় ৯০ জন স্বল্পমেয়াদী পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছে সংস্থাটি। এই দলগুলো মূলত ভোটকেন্দ্র খোলা, ব্যালট গণনা এবং ফলাফল তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়াগুলো সরাসরি প্রত্যক্ষ করবেন।
জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে কাজ করা ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষকের সাথে এই নতুন দলটি যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য, কানাডা, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডের প্রতিনিধিরাও এই মিশনে অংশ নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে ২০০ জনেরও বেশি অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষক ১২ ফেব্রুয়ারি মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় থাকবেন।
ইভার্স ইজাবস বলেন, “আমাদের পর্যবেক্ষকরা শহর থেকে গ্রাম—প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় উপস্থিত থাকবেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা একটি নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করব।”
নিরপেক্ষতার প্রশ্নে অটল ইইউ
ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক স্পষ্ট করে বলেন যে, তাদের কাজ কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা নয়। তারা কেবল একজন নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করবেন। ইজাবস বলেন, “আমরা ফলাফলের সনদ দিতে আসিনি, আমরা এসেছি প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করতে। বাংলাদেশের নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের মানুষের।”
আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ নির্বাচনের দুই দিন পর ইইউ মিশন তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। আর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আসতে সময় লাগবে প্রায় দুই মাস। সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষ্ণ নজর এখন বাংলাদেশের ওপর। ইইউর এই ইতিবাচক সুর নির্বাচনী আমেজকে আরও চাঙ্গা করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের দিন মাঠের বাস্তবতা কী দাঁড়ায় এবং ইইউর প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়, তা জানতে আরও ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের এই ‘নতুন অধ্যায়’ সফল হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

