আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সমগ্র দেশ যখন চূড়ান্ত প্রস্তুতির দ্বারপ্রান্তে, তখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো প্রকার ছাড় দিতে নারাজ সরকার। ভোটের মাঠের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা এবং সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা নিশ্চিত করতে এবার কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে দেশের সকল স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনের দিন এবং তার আগের রাতে স্থলপথে দেশের বাইরে যাওয়া বা ভেতরে প্রবেশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। মূলত নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য সহিংসতা, নাশকতা এবং অপরাধীদের পলায়ন রোধেই এই ‘লকডাউন’ সদৃশ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় ও স্থলবন্দর বন্ধের প্রেক্ষাপট
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই মহাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে যেন কোনো অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠকে এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন ভোর ৬টা থেকে পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি ভোর ৬টা পর্যন্ত—এই ২৪ ঘণ্টা দেশের সকল স্থলবন্দরের বহির্গমন ও আগমন কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত থাকবে। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্যে কোনো যাত্রী বা পণ্যবাহী যান সীমান্ত অতিক্রম করতে পারবে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে অনেক সময় দাগী আসামি, ঋণখেলাপি কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা দেশত্যাগের চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, সীমান্তের ওপার থেকে অবৈধ অস্ত্র বা বিস্ফোরক এনে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পায়তারাও করে থাকেন অনেকে। এই দ্বিমুখী ঝুঁকি কমাতেই ইমিগ্রেশন চেকপোস্টগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত।
সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রশাসনিক তৎপরতা
নির্বাচনকালীন এই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করতে সরকারের একাধিক সংস্থা একযোগে মাঠে নামছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মহাপরিচালক, পররাষ্ট্র সচিব এবং নৌপরিবহন সচিবের দপ্তরে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেবল নির্দেশ দেওয়াই নয়, বরং তা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে কঠোর তদারকির নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত নিরাপত্তা আমাদের কাছে রাষ্ট্রের ‘ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স’ বা প্রথম প্রতিরক্ষা রেখা। নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা যেসব প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তাতে সীমান্তের ছিদ্রপথ ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। তাই আমরা সীমান্তে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি।”
মিয়ানমার সীমান্ত ও বাড়তি সতর্কতা
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি ও দেশটির সেনাবাহিনীর মধ্যকার সংঘাতের জেরে বাংলাদেশ সীমান্তেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি এবং অস্ত্র চোরাচালানের আশঙ্কা এই মুহূর্তের অন্যতম বড় মাথাব্যথার কারণ। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সরকারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “মিয়ানমার সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে কোনো গোষ্ঠী যদি দেশে অস্ত্র ঢোকানোর চেষ্টা করে, তবে তা সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। নির্বাচনকালীন সময়ে সীমান্ত উন্মুক্ত রাখা হলো সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক সীমানা অনেক সময় সন্ত্রাসী বা অন্তর্ঘাতকারী গোষ্ঠীর জন্য ‘সফট এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করে। তাই এই মুহূর্তে সীমান্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী, সাহসী এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিচারে উচ্চমানের সিদ্ধান্ত।”
তিনি আরও যোগ করেন, নির্বাচনের ব্যস্ততায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন দেশের ভেতরের কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় ব্যস্ত থাকবে, তখন সীমান্তে বাড়তি জনবল দেওয়া কঠিন। তাই সীমান্ত সিলগালা করে দেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
পলায়নপর অপরাধীদের রুখতে কঠোর অবস্থান
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে অপরাধী চক্রের দেশত্যাগের প্রবণতা নতুন কিছু নয়। অতীতেও দেখা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আশঙ্কায় বা আইনি বিচার এড়াতে অনেক হাই-প্রোফাইল অপরাধী ও দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি নির্বাচনের সময়টিকে দেশত্যাগের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়ে বলেন, “অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব হলো—সবাই যখন ভোটের উৎসবে ব্যস্ত, তখন চুপিসারে কেটে পড়া। শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকারীর দেশত্যাগ নিয়ে যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছিল, তা আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। স্থলবন্দরগুলো অপরাধীদের জন্য দ্রুত ও ঝুঁকিমুক্ত পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকার সব স্থলবন্দর বন্ধ করে দেওয়ায় অপরাধী চক্রের এই ‘সহজ রুট’ বা পালানোর পথ বন্ধ হয়ে গেল। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।”
আইনি ভিত্তি ও যৌক্তিকতা
ভোটের দিন স্থলবন্দর বন্ধ রাখার এই সিদ্ধান্ত কি আইনসম্মত? এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, “রাষ্ট্র যখন নির্বাচন বা গণভোটের মতো কোনো সংবেদনশীল জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে, তখন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের মতো বিশেষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে। এটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং যৌক্তিক।”
ব্যারিস্টার জাহিদ আরও বলেন, “এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার বহির্বিশ্ব এবং দেশের অভ্যন্তরের অশুভ শক্তিগুলোকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিল। তা হলো—নির্বাচনের সময় কোনো বিদেশি প্রভাব, সাইবার বা শারীরিক অন্তর্ঘাত, কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধিকে রাষ্ট্র কোনোভাবেই হালকাভাবে নিচ্ছে না।”
গুজব ও নাশকতা রোধে ‘জিরো মুভমেন্ট’
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, কেবল অস্ত্র বা অপরাধী নয়, নির্বাচনের সময় সীমান্ত এলাকা দিয়ে বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির অপচেষ্টাও অতীতে দেখা গেছে। বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অনেক পুরনো কৌশল। স্থলবন্দরে ‘জিরো মুভমেন্ট’ নীতি কার্যকর থাকলে এই ধরনের অপতৎপরতা চালানোর সুযোগ কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, “একটি অস্ত্র, একটি বিস্ফোরক বা একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি ঢুকে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। আমরা চাই না নির্বাচনকালীন সময়ে কেউ আইন এড়িয়ে পালিয়ে যাক কিংবা বাইরে থেকে কেউ এসে পরিস্থিতি উসকে দিক। আমাদের লক্ষ্য একটাই—একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং নিরাপদ নির্বাচন উপহার দেওয়া।”
নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপ কমানোর কৌশল
নির্বাচনের দিন পুলিশ, র্যাব, আনসার এবং সেনাবাহিনীর সদস্যদের মূল মনোযোগ থাকে ভোটকেন্দ্র এবং ভোটারদের নিরাপত্তার দিকে। এই বিপুল সংখ্যক জনবলকে যখন দেশের অভ্যন্তরে মোতায়েন করা হয়, তখন সীমান্তে নিয়মিত ইমিগ্রেশন কার্যক্রম চালু রাখাটা লজিস্টিক বা যৌক্তিক—উভয় দিক থেকেই চ্যালেঞ্জিং।
স্থলবন্দরে যাত্রী পারাপার চালু থাকলে সেখানেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ ও গোয়েন্দা সদস্যকে মোতায়েন রাখতে হয়। চেকপোস্ট বন্ধ রাখার ফলে সেই জনবলকে এখন নির্বাচনী এলাকার নিরাপত্তায় কাজে লাগানো সম্ভব হবে। একে ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’র মতো কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। একদিকে সীমান্ত নিশ্ছিদ্র করা হলো, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় জনবল বাড়ানো হলো।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার একটি মাইলফলক। এই যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে সরকারের স্থলবন্দর বন্ধের সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে একটি কঠোর কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
আগামী ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশের সীমান্তগুলো যখন নীরব থাকবে, তখন দেশের অভ্যন্তরে কোটি কোটি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সরকারের এই কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভোটারদের মনে কতটা স্বস্তি আনতে পারে এবং দিনশেষে নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ হয়—সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকার এবার বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়।

