রাজধানী ঢাকার কর্মব্যস্ত জীবন ছেড়ে বাড়ির পথে পা বাড়ানো মানুষের স্রোত যেন থামছেই না। তবে এবারের যাত্রা ঈদের আনন্দ উদযাপনের জন্য নয়, বরং একটি বড় নাগরিক দায়িত্ব পালনের টানে—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই ঢাকা ও এর আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে ঘোষিত ছুটির পর থেকেই মহাসড়কে মানুষের ঢল নামে। কিন্তু এই জনস্রোতের বিপরীতে গণপরিবহনের অপ্রতুলতা আর অব্যবস্থাপনার চিত্র পুরো যাত্রাপথকে পরিণত করেছে এক অসহনীয় অভিজ্ঞতায়।
বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক আজ সকাল থেকেই কার্যত স্থবির। আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত দীর্ঘ পথের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে মানুষের অপেক্ষা আর হতাশার চিত্র স্পষ্ট। একদিকে তীব্র যানজট, অন্যদিকে বাসের কৃত্রিম সংকট—সব মিলিয়ে ঘরমুখো মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ছুটিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ যখন ভোট দিতে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্য যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মহাসড়কে জনস্রোত, চাকা ঘুরছে ধীরলয়ে
মঙ্গলবার সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে না হতেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চিত্র পাল্টে যেতে থাকে। শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিশেষ ছুটি ঘোষণা করায় লাখো শ্রমিক একযোগে রাস্তায় নেমে আসেন। আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী, স্টেশন রোড, কলেজগেট এবং গাজীপুরা এলাকায় দেখা যায় হাজারো মানুষের জটলা। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বাসের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। যে কয়েকটি বাস চলছে, তাও যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত সড়কের একপাশ কার্যত অবরুদ্ধ। যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর ধুলোবালি মিশ্রিত বাতাসে যাত্রীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল বর্ণনাতীত। অনেককে দেখা গেছে ভারী ব্যাগ ও বোঁচকা নিয়ে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে সামনে এগোতে, যদি সামনে কোনো গাড়ি পাওয়া যায়—সেই আশায়।
স্থানীয় ট্রাফিক বিভাগের সদস্যদের হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “হঠাৎ করে এত মানুষ রাস্তায় নামবে, তা ধারণা করা হলেও যানবাহনের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে বাসগুলো যাত্রী তোলার জন্য দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় পেছনে জট বাড়ছে।”
ভাড়া নৈরাজ্য: সুযোগের অপেক্ষায় পরিবহন শ্রমিকরা
প্রতিবার বড় কোনো ছুটি বা উৎসবের আগে যেমনটি ঘটে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাস সংকটের দোহাই দিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ সময়ে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে যেতে যেখানে একজন যাত্রীর খরচ হতো ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, আজ সেখানে গুণতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কোথাও কোথাও এই অংক ৭০০ টাকাও ছাড়িয়ে গেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, বাস মালিক ও শ্রমিকরা সিন্ডিকেট করে এই অরাজকতা তৈরি করছে। বাসের সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাধ্য হয়ে যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি হয়।
ময়মনসিংহগামী যাত্রী আলমগীর হোসেনের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, “ভাই, ভোট দিতে বাড়ি যাচ্ছি, এটা তো আনন্দের বিষয় হওয়ার কথা। কিন্তু রাস্তায় নেমে মনে হচ্ছে যুদ্ধ করতে এসেছি। সাধারণ সময়ে ২৫০ টাকায় বাড়ি যাই। আজ সকালে বাসে উঠতে গেলাম, হেল্পার সোজাসুজি জানিয়ে দিল ৬০০ টাকার এক টাকাও কম হবে না। প্রতিবাদ করলে বলে, ‘না পোষালে যাবেন না’। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আসলে কোনো উপায় নেই, বাধ্য হয়েই এই ডাকাতি মেনে নিতে হচ্ছে।”
আলমগীরের মতো হাজারো মানুষ আজ জিম্মি পরিবহন খাতের এই স্বেচ্ছাচারিতার কাছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের জন্য এই বাড়তি ভাড়ার বোঝা বহন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তবুও ভোটের টানে, মাটির টানে তারা ছুটছেন।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকে বাড়ি ফেরা
বাস না পেয়ে উপায়হীন হয়ে মানুষ ঝুঁকছে বিকল্প ও বিপজ্জনক বাহনের দিকে। গাজীপুর চৌরাস্তা ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এক লোমহর্ষক দৃশ্য। শত শত মানুষ ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, এমনকি পণ্যবাহী লরিগুলোর ছাদে চড়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছেন।
গার্মেন্টকর্মী রাবেয়া খাতুন দীর্ঘ তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো বাসে উঠতে পারেননি। তিনি বলেন, “ভোটের জন্য ছুটি দিয়েছে, তাই বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছি, কোনো বাস নেই। যেগুলো আসছে, সেগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এখন শুনছি ট্রাকেও জনপ্রতি ৪০০ টাকা করে নিচ্ছে। আমাদের মতো গরিবের জানের কোনো দাম নেই। বাধ্য হয়েই ট্রাকে উঠতে হবে, এছাড়া তো বাড়ি যাওয়ার উপায় দেখছি না।”
খোলা ট্রাকে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহনের ভিড়ে এই খোলা ট্রাকগুলো যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তবুও বাড়ি ফেরার অদম্য ইচ্ছা আর পরিবহনের অভাব মানুষকে এই মরণফাঁদে পা দিতে বাধ্য করেছে।
বাসের চালকরাও এই সুযোগে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছেন না। অভিযোগ রয়েছে, অনেক আন্তঃজেলা বাস নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করে যাত্রী বেশি পাওয়ার আশায় ছোট ছোট ট্রিপ দিচ্ছে। এতে দূরপাল্লার যাত্রীরা যেমন বিপাকে পড়ছেন, তেমনি লোকাল রুটেও তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
নির্বাচনী ছুটি ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ভোটারদের সুবিধার্থে বেশ কয়েক দিনের ছুটির ব্যবস্থা করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল যে, ১১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন সাধারণ ছুটি থাকবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি শিল্পাঞ্চলের বিশেষ ছুটি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্যই এই টানা ছুটির বন্দোবস্ত। সরকারি, আধা-সরকারি, এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য এই সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ছুটির কাগজ আর বাস্তব চিত্রের মধ্যে যে যোজন যোজন দূরত্ব, তা আজকের মহাসড়ক প্রমাণ করে দিয়েছে।
ছুটি ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষ যেন ধীরস্থিরভাবে বাড়ি ফিরতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পরিকল্পনার অভাবে সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। পরিবহন খাতের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে—এটা অনুমেয় হলেও, তা নিরসনে কোনো কার্যকর পূর্বপ্রস্তুতি চোখে পড়েনি। বিআরটিসি বা সরকারি কোনো বিশেষ বাস সার্ভিসের তৎপরতাও খুব একটা দৃশ্যমান নয়। ফলে পুরোটাই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বেসরকারি পরিবহন খাতের মর্জির ওপর।
ভোগান্তির মানবিক আখ্যান
রাস্তায় আটকে থাকা প্রতিটি মানুষের একেকটি গল্প আছে। কেউ বাড়ি যাচ্ছেন বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে ভোট দিতে, কেউবা প্রথম ভোটার হিসেবে রোমাঞ্চিত। কিন্তু এই রোমাঞ্চ এখন ক্লান্তি আর ক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
গাজীপুরার বাসস্ট্যান্ডে দেখা মিলল পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তির সাথে, যিনি তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, “নির্বাচন তো গণতন্ত্রের উৎসব। কিন্তু এই উৎসব পালন করতে গিয়ে যদি রাস্তায় জানটাই যায়, তাহলে লাভ কী? সরকারের উচিত ছিল ছুটির পাশাপাশি আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থাটাও একটু দেখা। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার জন্য কেউ কিছু বলছে না, পুলিশও নীরব।”
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ অফিস ছুটির পর আরও বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নামবে। তখন বাসের সংকট আরও তীব্র হবে এবং ভাড়ার পারদ আরও চড়বে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেষ কথা
গণতন্ত্রের প্রধান অনুষঙ্গ হলো নির্বাচন, আর সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নাগরিকের অধিকার। কিন্তু এই অধিকার প্রয়োগের পথটা যদি এতটা কণ্টকাকীর্ণ হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মানুষের এই বাড়ি ফেরা প্রমাণ করে, শত ভোগান্তি সত্ত্বেও মানুষ ভোট দিতে চায়।
এখন প্রশ্ন হলো, আগামী দুই দিন অর্থাৎ ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে? প্রশাসনের নজরদারি কি বাড়বে, নাকি পরিবহন সিন্ডিকেটের কাছেই জিম্মি থাকবে সাধারণ জনতা? ঘরমুখো মানুষের একটাই চাওয়া—অন্তত ফেরার পথটা যেন নিরাপদ হয়, আর পকেটের টাকাটা যেন গায়ের জোরে কেড়ে নেওয়া না হয়। ভোটের আমেজ যেন রাস্তার ভোগান্তিতে ম্লান না হয়ে যায়, সেটাই এখন সবার প্রত্যাশা।

