বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোটকে সামনে রেখে বৈশ্বিক আগ্রহ এখন তুঙ্গে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের কড়া নজরদারির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক এই নির্বাচনী মহাযজ্ঞ সরাসরি কভার করতে বাংলাদেশে আসছেন।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জনসংযোগ অধিশাখা সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বিদেশি অতিথিদের জন্য সব ধরনের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশে একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হতে চলায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের এই উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইসির দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট ৫৪০ জন অতিথির মধ্যে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী সংস্থা থেকে আসছেন প্রায় ৬০ জন প্রতিনিধি। তাদের সরাসরি আমন্ত্রণ জানিয়েছে বাংলাদেশের ইসি। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে থাকছেন ৩৩০ জন অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষক, যারা মাঠপর্যায়ে ভোটের পরিবেশ যাচাই করবেন।
নির্বাচনী উত্তাপ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে উপস্থিত থাকবেন ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রায় ১৫০ জন সাংবাদিক। এদের মধ্যে কাতারভিত্তিক আল জাজিরা, ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি নিউজ, রয়টার্স, এপি, জাপানিজ এনএইচকে এবং ডয়েচে ভেলের মতো প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পাকিস্তান থেকে সর্বোচ্চ ৪৮ জন সাংবাদিক এই নির্বাচন কভার করতে আসছেন।
আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিদের তালিকায় রয়েছেন ভুটান ও নাইজেরিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মালয়েশিয়ার নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার আইসিএপিপি-এর স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান। এছাড়া তুরস্ক থেকে একটি শক্তিশালী ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল আসছে, যার মধ্যে দেশটির ৬ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, জর্ডান ও ইরান থেকেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বহর পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তাদের মোট ২২৩ জন প্রতিনিধি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থেকে ভোটের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এছাড়া কমনওয়েলথ থেকে ২৫ জন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (অ্যানফ্রেল) থেকে ২৮ জন এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) থেকে ১২ জন পর্যবেক্ষক আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পরিচালক (জনসংযোগ) মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানিয়েছেন, বিদেশি অতিথিদের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করা হয়েছে। যাদের বাংলাদেশে কূটনৈতিক মিশন নেই, তাদের জন্য ‘অন অ্যারাইভাল’ ভিসার সুবিধাও রাখা হয়েছে। অতিথিরা যাতে স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ প্রটোকল নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ‘হেল্প ডেস্ক’ ও ‘মিডিয়া সেল’ স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে তারা তাৎক্ষণিক ফলাফল ও নির্বাচনী আপডেট সংগ্রহ করতে পারবেন। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের অভ্যর্থনা জানাতে ২৪ ঘণ্টা বিশেষ টিম কাজ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। একই দিনে ‘জুলাই সংস্কার সনদ’ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বিশ্ববাসীর কাছে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করা নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বিশাল সংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে আশা করছে সাধারণ মানুষ। ৫৪০ জন বিদেশি প্রতিনিধির এই অংশগ্রহণ মূলত বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বিশ্ব সম্প্রদায়ের গভীর আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

